যুক্তরাজ্যের অর্থমন্ত্রী র্যাচেল রিভস সুপারমার্কেটগুলোকে রুটি, ডিম ও দুধের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেঁধে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ইরান যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া মূল্যস্ফীতি সামাল দিতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিনিময়ে ব্যবসায়ীদের জন্য কিছু সরকারি নিয়মকানুন শিথিল করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
খুচরা ব্যবসায়ীরা এই প্রস্তাবে তীব্র ক্ষোভ জানিয়েছেন।
তারা একে জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবিলার `বেপরোয়া` চেষ্টা হিসেবে দেখছেন। এক সুপারমার্কেট কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ডাউনিং স্ট্রিট বাজার ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ একেবারে হারিয়ে ফেলেছে। স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টিও সম্প্রতি প্রায় একই ধরনের প্রস্তাব দিয়েছে। সেখানে ৫০টি জরুরি খাদ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে।
মার্চ মাসে খাদ্য ও পানীয় খাতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিকস কার্যালয় এই তথ্য দিয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় সারসহ বিভিন্ন জরুরি পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে এই মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। দাম বেঁধে দেওয়ার প্রস্তাব মানলে সুপারমার্কেটগুলোকে কিছু সরকারি নীতি থেকে ছাড় দেওয়া হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে নেট জিরো প্যাকেজিং নীতি এবং স্বাস্থ্যকর খাবার বিক্রির বাধ্যবাধকতা পিছিয়ে দেওয়া।
ট্রেজারি বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এরই মধ্যে বেশ কয়েকজন সুপারমার্কেট নির্বাহীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। প্রায় ২০টি পণ্যের দাম সাময়িক ও স্বেচ্ছায় নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে এই আলোচনায়।
ছায়া ব্যবসায়ী বিষয়ক মন্ত্রী অ্যান্ড্রু গ্রিফিথ এই প্রস্তাবের কড়া সমালোচনা করেছেন। তিনি একে রিভসের `অর্থনৈতিক অজ্ঞতা` বলে মন্তব্য করেন। গ্রিফিথের মতে, সরকারের আগের সিদ্ধান্তগুলোই সাধারণ পরিবারের খরচ বাড়িয়েছে এবং এখন তারা অন্যদের ঘাড়ে দোষ চাপাতে চাইছে।
এর আগে সুপারমার্কেট প্রধানদের ডাউনিং স্ট্রিটে ডেকেছিলেন অর্থমন্ত্রী। অতিরিক্ত মুনাফা করার অভিযোগে সরকার তাদের কালিমালিপ্ত করতে পারে, এমন আশঙ্কায় অনেকেই শুরুতে বৈঠকে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান।
পরে বৈঠকটি পুনর্নির্ধারণ করা হয়। সেখানে সুপারমার্কেট নির্বাহীরা খরচ কমানোর কিছু বিকল্প প্রস্তাব দেন। এর মধ্যে জ্বালানি বিলে সরকারি শুল্ক কমানোর বিষয়টিও ছিল। লেবার পার্টির শাসনামলে ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স, ন্যূনতম মজুরি এবং ব্যবসা কর বাড়ায় সুপারমার্কেটগুলো এমনিতেই চাপে রয়েছে।
ব্রিটিশ রিটেইল কনসোর্টিয়ামের প্রধান নির্বাহী হেলেন ডিকিনসন একে ১৯৭০-এর দশকের ব্যর্থ নীতির সঙ্গে তুলনা করেছেন।
তিনি জানান, সুপারমার্কেটগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতার কারণেই যুক্তরাজ্যে মুদিপণ্যের দাম এখনো পশ্চিম ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে কম। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি ও পণ্যের দাম এমনিতেই বেশি। এর ওপর সরকারের অভ্যন্তরীণ নীতির খরচও বাড়ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার সরকারি উদ্যোগে গ্রামীণ ব্যবসাগুলো এরই মধ্যে চাপের মুখে রয়েছে। নতুন এই নীতি কার্যকর হলে সুপারমার্কেটগুলো সস্তা বিদেশি খাবারের দিকে ঝুঁকতে পারে এবং ব্রিটিশ কৃষকরা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে যুক্তরাজ্যের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির প্রস্তাবিত নীতিটিকে `অর্থনৈতিক পাগলাগারদ` বলে আখ্যায়িত করেছিলেন জন লুইস-এর সাবেক প্রধান স্যার অ্যান্ডি স্ট্রিট।
খুচরা বিশ্লেষক ক্লাইভ ব্ল্যাক মনে করেন, সুপারমার্কেটে দাম বেঁধে দেওয়ার নীতি ইতিহাসে কখনো সফল হয়নি। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের উদাহরণ টেনে বলেন, সেখানে খাদ্যের মান ও পছন্দ একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল। এই ধরনের প্রস্তাব যুক্তরাজ্যকে অকার্যকর রাষ্ট্রের কাতারে নামিয়ে আনতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
