যুক্তরাজ্যের মূল্যস্ফীতি গত এক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিকস কার্যালয়ের (ওএনএস) তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলে এই হার কমে ২ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। মূলত জ্বালানি নিয়ন্ত্রক সংস্থা অফজেম বার্ষিক গৃহস্থালি বিল ১১৭ পাউন্ড কমানোর ফলে এই ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৩ দশমিক ৩ শতাংশ।
কিন্তু অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন যে এটি একটি সাময়িক বিরতি মাত্র।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে এ বছরের শেষের দিকে নিত্যপণ্যের দাম হু হু করে বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাস থেকে প্রতি লিটার পেট্রোলের দাম ২৫ পেন্সের বেশি বেড়েছে। মঙ্গলবার পেট্রোলের দাম ইরান যুদ্ধ শুরুর পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস রপ্তানির এক-পঞ্চমাংশ যাতায়াত করে, যা এখন কার্যত বন্ধ রয়েছে।
আইসিএইডব্লিউ-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ সুরেন থিরু জানিয়েছেন, এপ্রিলের এই পতন আসলে ইরান যুদ্ধজনিত মূল্যস্ফীতির ঝড় আঘাত হানার আগের শেষ বিরতি। অর্থমন্ত্রী র্যাচেল রিভস জ্বালানি বিল থেকে বেশ কয়েকটি পরিবেশবান্ধব শুল্ক প্রত্যাহার করায় অফজেম তাদের প্রাইস ক্যাপ কমাতে সক্ষম হয়। এর ফলে এপ্রিলে বিদ্যুতের দাম এক ধাক্কায় ৮ দশমিক ৪ শতাংশ কমে যায়। রিভস জানিয়েছেন, বিশ্বব্যাপী অস্থিতিশীলতার মধ্যে অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং নীতি পরিবর্তন করলে স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়বে।
ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস ও বাজারের প্রতিক্রিয়া
ব্যাংক অব ইংল্যান্ড পূর্বাভাস দিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। তাদের মতে, সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে। জ্বালানি বিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কর্নওয়াল ইনসাইট জানিয়েছে, উষ্ণ আবহাওয়া সত্ত্বেও জুলাই মাস থেকে অফজেম তাদের প্রাইস ক্যাপ ১৩ শতাংশ বাড়িয়ে বার্ষিক ১,৮৫০ পাউন্ড করতে পারে।
আর্থিক বাজারে এই মূল্যস্ফীতি কমার খবরের তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে।
মূল্যস্ফীতি আশাতীতভাবে কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা ধারণা করছেন, ব্যাংক অব ইংল্যান্ড আগামী মাসে সুদের হার বাড়াবে না। এর ফলে ডলারের বিপরীতে পাউন্ডের মান শূন্য দশমিক ১ শতাংশ কমে ১ দশমিক ৩৩৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে ইউরোর বিপরীতে তা ১ দশমিক ১৫৫ ডলারে প্রায় অপরিবর্তিত ছিল। জুনে মনিটারি পলিসি কমিটির পরবর্তী বৈঠকের পর সুদের হার ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশেই রাখা হতে পারে বলে মানি মার্কেটগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে।
জেফারিজের অর্থনীতিবিদ মোদুপে আদেগবেম্বো মনে করেন, এই তথ্য ব্যাংক অব ইংল্যান্ডকে তাদের বর্তমান অবস্থানে থাকতে বাধ্য করবে। সরকারি ঋণের খরচ বা বন্ড ইয়েল্ডও ব্যাপকভাবে কমেছে। ট্রেজারি বেঞ্চমার্ক হিসেবে পরিচিত ১০ বছর মেয়াদি গিল্টের ইয়েল্ড ৫ দশমিক ১৩ শতাংশ থেকে কমে ৫ দশমিক ০৭ শতাংশে নেমেছে।
সুদের হারের প্রতি সংবেদনশীল দুই বছর মেয়াদি গিল্টের ইয়েল্ড ৪ দশমিক ৫১ শতাংশ থেকে ৪ দশমিক ৪৩ শতাংশে নেমে আসে। ডাচ ব্যাংক আইএনজি-এর অর্থনীতিবিদ জেমস স্মিথের মতে, বাজার ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের নীতি কঠোর করার ইচ্ছাকে অতিরঞ্জিত করে দেখছে। বিনিয়োগকারীরা আগামী বসন্তের মধ্যে দুই থেকে তিনবার সুদের হার বাড়ানোর প্রত্যাশা করছেন। তবে স্মিথ মনে করেন, ব্যাংক হয়তো একবার সুদের হার বাড়াবে অথবা একেবারেই বাড়াবে না।
অন্তর্নিহিত অর্থনৈতিক চাপ
বড় ব্যাংকগুলো সতর্ক করেছে, যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে জিনিসপত্রের দাম বাড়ার লক্ষণ এখনো স্পষ্ট।
ডয়েচে ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ সঞ্জয় রাজা জানিয়েছেন, পণ্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে সামনে খাদ্যের দাম আরও বাড়বে। জেপি মরগানের বিশ্লেষক স্কট গার্ডনার বলেন, এপ্রিলের মূল্যস্ফীতি কমার খবরটি অর্থনীতির অন্তর্নিহিত চাপগুলোকে আড়াল করতে পারবে না। উৎপাদন এবং সেবা উভয় খাতেই কাঁচামালের দাম বেড়েছে। প্যানথিয়ন ম্যাক্রোইকোনমিক্সের রব উড জানিয়েছেন, অর্থমন্ত্রী কিছু দাম আটকে রাখায় মূল্যস্ফীতি আপাতত কমেছে, তবে এটি মূলত বিমান ভাড়া ও প্যাকেজ হলিডে-র মতো অনিয়মিত খাতের কারণে হয়েছে।
ওভারনাইট ইনডেক্স সোয়াপ অনুযায়ী, জুনে সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা এখন মাত্র ১৫ শতাংশ। গত সপ্তাহের শুরুতে এই সম্ভাবনা ছিল ৪৩ শতাংশ। ডব্লিউপিআই স্ট্র্যাটেজির প্রধান অর্থনীতিবিদ মার্টিন বেক মনে করেন, মূল্যস্ফীতির সর্বোচ্চ চূড়া নির্ভর করবে ইরানের কূটনৈতিক অগ্রগতির ওপর। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এটি ৩ দশমিক ৫ থেকে ৪ শতাংশে গিয়ে আবার কমতে পারে। তবে উত্তেজনা বাড়লে তা ৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক হবে না বলে তিনি সতর্ক করেছেন।
