দেশের কর প্রশাসনকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ এবং ব্যবসাবান্ধব করে গড়ে তুলতে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তনের পথে হাঁটছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। বর্তমানে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতি মাসের হিসাব পরবর্তী মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে অনলাইনে দাখিল করতে হয়, ফলে একজন করদাতাকে বছরে ১২ বার রিটার্ন জমা দিতে হয়। তবে এনবিআর এখন এই বাধ্যবাধকতা শিথিল করে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে রিটার্ন জমা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে করদাতারা বছরে মাত্র চারবার রিটার্ন দাখিল করেই তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন।
এনবিআরের এই উদ্যোগ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য বড় স্বস্তি বয়ে আনবে। দেশের অধিকাংশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের আলাদা হিসাব বিভাগ নেই এবং প্রতি মাসে রিটার্ন প্রস্তুত করা তাদের জন্য একটি বড় প্রশাসনিক ও আর্থিক চাপ। অনেক উদ্যোক্তাকে কেবল রিটার্ন প্রস্তুতের জন্য বাড়তি পরামর্শক রাখতে হয়। এনবিআরের নতুন ব্যবস্থায় এই অতিরিক্ত ব্যয় কমবে এবং কর পরিপালন প্রক্রিয়া অনেক সহজ হবে। এছাড়া ডিজিটাল অডিট ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা প্রবর্তনের ফলে ব্যবসায়ীদের আর অডিটের জন্য কাগজপত্র নিয়ে দপ্তরে দৌড়াতে হবে না।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় আট লাখ ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এই সংখ্যা ২০ লাখে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। করদাতাবান্ধব নীতি গ্রহণ এবং রিটার্ন দাখিলের জটিলতা কমানোর মাধ্যমেই এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা কার্যকর হলে কর ফাঁকি শনাক্ত করা সহজ হবে এবং কর প্রশাসনের জবাবদিহিতাও বাড়বে।
ব্যবসায়ী নেতারা এনবিআরের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, প্রতি মাসে রিটার্ন দাখিলের চাপের কারণে ব্যবসায়ীদের হিমশিম খেতে হয়, নতুন ব্যবস্থায় তাদের সময় ও অর্থ সাশ্রয় হবে। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন যে, এই পুরো প্রক্রিয়াটি যেন পুরোপুরি অনলাইনে সম্পন্ন হয় এবং অফিসমুখী না হয়। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকীন আহমেদও এই উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেছেন যে, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের হয়রানি কমাতে এটি একটি মাইলফলক হতে পারে, যদি ডিজিটাল সেবার ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়।
কর বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ত্রৈমাসিক রিটার্ন দাখিল এবং সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ভ্যাট ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। এতে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় হ্রাস পাবে এবং করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। সরকারের রাজস্ব আহরণ প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী হবে এবং ব্যবসায়ীরা কোনো ভয় ছাড়াই কর ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন। এনবিআরের এই সংস্কার ব্যবসাবান্ধব কর প্রশাসন গঠনের পথে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
