সামান্য কোনো আঘাতেই হাড় ভেঙে যাওয়া কিংবা সিঁড়ি থেকে নামার সময় আচমকা ফ্র্যাকচার হওয়া মূলত মানবদেহের একটি নীরব স্বাস্থ্য জটিলতার বড় লক্ষণ। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় হাড়ের এই বিপজ্জনক পরিস্থিতিকে অস্টিওপরোসিস বা হাড়ের মারাত্মক ক্ষয়জনিত রোগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই রোগে হাড়ের অভ্যন্তরীণ সামগ্রিক ঘনত্ব বা ক্যালসিয়ামের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গিয়ে ভেতরে অসংখ্য ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ফাঁকা জায়গার সৃষ্টি হয়।
বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে হাড়ের স্বাভাবিক শক্তি ও স্থায়িত্ব হ্রাস পাওয়া একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
চিকিৎসকদের মতে মানবদেহের হাড় সাধারণত ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী এবং সুগঠিত থাকে। এর পর থেকে প্রাকৃতিকভাবেই হাড়ের পুনর্গঠনের চেয়ে ক্ষয়ের হার বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। এই রোগে পুরুষদের তুলনায় নারীরা অনেক বেশি স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির মুখোমুখি হয়ে থাকেন, বিশেষ করে মেনোপজ বা ঋতুস্রাব স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়ার পর নারীদের শরীরে হরমোনের আকস্মিক পরিবর্তনের ফলে এই ক্ষয় প্রক্রিয়া তীব্র গতিতে অগ্রসর হয়। এছাড়া দৈনিক অপুষ্টি, দীর্ঘমেয়াদি কিছু ওষুধের অপব্যবহার, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, অতিরিক্ত ধূমপান এবং বংশগত পারিবারিক ইতিহাস এই রোগের ঝুঁকি বহু গুণ বাড়িয়ে দেয়।
অস্টিওপরোসিসের সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক সংকট হলো এটি প্রাথমিক অবস্থায় শরীরে কোনো স্পষ্ট বা দৃশ্যমান উপসর্গ প্রকাশ করে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হাড় সম্পূর্ণ ভেঙে যাওয়ার পরই রোগটি প্রথম ধরা পড়ে এবং পরবর্তীতে কোমর বা মেরুদণ্ডে তীব্র ব্যথা, উচ্চতা হ্রাস পাওয়া বা শরীর সামনের দিকে বেঁকে যাওয়ার মতো স্থায়ী জটিলতা তৈরি হয়। তবে সচেতন জীবনযাত্রা এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে এই নীরব হাড়ের ক্ষয়ের গতিকে অনেকাংশে ধীর করে দেওয়া সম্ভব। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি এবং প্রোটিন সমৃদ্ধ পুষ্টিকর খাবার রাখা হাড়ের সুরক্ষায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। চিকিৎসকদের মতে নিয়মিত নিয়মমাফিক হাঁটাচলা এবং হালকা ওজন নিয়ে ব্যায়াম করা হাড়ের টিস্যুগুলোকে সচল রাখতে সাহায্য করে।
হাড়ের ভেতরের প্রকৃত ঘনত্ব পরীক্ষা করার জন্য চিকিৎসকরা ডেক্সা নামক একটি বিশেষ স্ক্যান ব্যবহার করেন।
এই স্ক্যানের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করেই মূলত চিকিৎসকরা ওষুধের মাত্রা এবং প্রয়োজনীয় ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট ব্যবহারের নির্দেশ প্রদান করে থাকেন। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে থেকে কোনো ধরনের সাপ্লিমেন্ট বা হরমোন থেরাপি গ্রহণ করা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণ হতে পারে। নিয়মিত সকালের নরম রোদে হাঁটা, হালকা মুক্ত ব্যায়াম এবং ক্ষতিকর অভ্যাস বর্জনের মাধ্যমেই এই ক্ষয়ের হাত থেকে শরীরকে দীর্ঘকাল সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।
