বিশ্বের লাখো মুসলমান যখন পবিত্র মক্কা নগরীতে সমবেত হয়ে হজের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করছেন, তখন অবরুদ্ধ গাজা ভূখণ্ডের ফিলিস্তিনিদের জীবনে নেমে এসেছে টানা তৃতীয় বছরের মতো গভীর হতাশা। ইসরায়েলি সীমান্ত বন্ধ এবং কঠোর সামরিক অবরোধের কারণে এই বছরও গাজার কোনো নাগরিক পবিত্র হজ পালনের জন্য মক্কায় যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না। ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবরের যুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই গাজার সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করত তেল আবিব, তবে যুদ্ধপরবর্তী সময়ে এই ধর্মীয় বঞ্চনা চরম রূপ ধারণ করেছে।গাজার হাজার হাজার বয়োবৃদ্ধ এবং অসুস্থ মানুষ এখন অবরুদ্ধ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।
ফিলিস্তিনের ওয়াকফ ও ধর্মীয় বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মিশর সীমান্তবর্তী রাফাহ ক্রসিং ইসরায়েলি বাহিনী বন্ধ রাখায় গত তিন বছরে ১০ হাজারের বেশি গাজাবাসী হজ পালন থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এমনকি পূর্ববর্তী বছরগুলোতে হজের লটারিতে নাম আসা অন্তত ৭১ জন নিবন্ধিত হজযাত্রী হজে যাওয়ার আগেই ইসরায়েলি হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন। বর্তমানে গাজার ২৩ লাখ জনসংখ্যার সিংহভাগই বাস্তুচ্যুত হয়ে তাঁবুতে বসবাস করছেন, যেখানে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ফলে এ পর্যন্ত ৭২,৭৭৫ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ২০২৫ সালের অক্টোবরে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও ইসরায়েল গাজার ৬০ শতাংশের বেশি এলাকা দখল করে সামরিক অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
ফিলিস্তিন পলিটিক্যাল স্টাডিজ সেন্টারের (পিসিপিস) মে ২০২৬-এর একটি গবেষণা প্রতিবেদনে গাজার হজ ও ওমরাহ খাতের এই ধ্বংসযজ্ঞকে ‘কাঠামোগত অর্থনৈতিক গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। অ্যাসোসিয়েশন অব হজ অ্যান্ড ওমরাহ কোম্পানিজের তথ্যমতে, গাজার নিবন্ধিত ৭৮টি ট্রাভেল এজেন্সির সবকটিই যুদ্ধের কারণে ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে খাতটি প্রায় ৪০ লাখ ডলারের সরাসরি পুঁজি হারিয়েছে এবং সৌদি আরব ও মিশরের বিমান ও হোটেল বুকিংয়ে আরও ২০ থেকে ৩০ লাখ ডলারের তহবিল আটকে রয়েছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে ফেলেছে।
আইনি বিশ্লেষকরা বলছেন, ধর্মীয় উদ্দেশ্যে ভ্রমণে বাধা দেওয়া আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার চুক্তির ১৮ ও ১২ নম্বর অনুচ্ছেদের সরাসরি লঙ্ঘন। চতুর্থ জেনেভা কনভেনশনের ৩৩ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এটি একটি ‘সমষ্টিগত শাস্তি’, যা আন্তর্জাতিক আইনে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। গাজার দীর্ঘদিনের কোটা পূরণ করতে বর্তমানে মিশরসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত গাজার আইডিধারী ফিলিস্তিনিদের এবং পশ্চিম তীরের বাসিন্দাদের সাময়িকভাবে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। গাজার ধর্মীয় মন্ত্রণালয় বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে এই পবিত্র ইবাদতকে রাজনৈতিক সমীকরণ থেকে মুক্ত রাখার জরুরি আহ্বান জানিয়েছে।
