ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে গত এপ্রিল মাসটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকরা। গত কয়েক মাসের যুদ্ধ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে ওয়াশিংটনভিত্তিক প্রভাবশালী থিঙ্কট্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার (আইএসডব্লিউ) তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে রাশিয়া এপ্রিলে যতটুকু এলাকা দখল করেছে তার চেয়ে বেশি এলাকা ইউক্রেনের কাছে হারিয়েছে। এই প্রথমবারের মতো রণক্ষেত্রের পাল্লা ইউক্রেনের দিকে ঝুঁকে পড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, যা মস্কোর দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার জন্য বড় ধাক্কা হতে পারে। রয়টার্স ও আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী ইউক্রেনের সেনাবাহিনী এপ্রিলে বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করেছে।
আইএসডব্লিউ-এর বিশ্লেষণ বলছে যে গত এপ্রিল মাসে রুশ বাহিনী নিট ১১৬ বর্গকিলোমিটার বা ৪৫ বর্গমাইল এলাকা হারিয়েছে। এই হিসাবটি করা হয়েছে কেবল সেই সব অঞ্চলের ওপর ভিত্তি করে যা দুই পক্ষই শক্তভাবে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। যুদ্ধের তথাকথিত ‘গ্রে জোন’ বা ধূসর এলাকাগুলোকে এই হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছে যেখানে কোনো পক্ষেরই একক নিয়ন্ত্রণ নেই। থিঙ্কট্যাঙ্কটি উল্লেখ করেছে যে গত ১৮ মাসে রাশিয়ার সামরিক অগ্রগতির হার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কমে গেছে। ২০২৫ সালের শুরুর দিকে রুশ বাহিনী যেখানে দিনে গড়ে ৯.৭৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা দখল করছিল সেখানে ২০২৬ সালের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২.৯ বর্গকিলোমিটারে।
রণক্ষেত্রে রাশিয়ার এই স্থবিরতার পেছনে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে তাদের বিপুল পরিমাণ সৈন্যক্ষয়। ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মিখাইলো ফেডোরোভ দাবি করেছেন যে কেবল এপ্রিল মাসেই ৩৫ হাজার ২০৩ জন রুশ সৈন্য নিহত অথবা গুরুতর আহত হয়েছে। ফেডোরোভের মতে রাশিয়া ধীরে ধীরে তাদের সৈন্যক্ষয়ের ভারে তলিয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেনীয় গোয়েন্দা নথির বরাতে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি গত মার্চ মাসে জানিয়েছিলেন যে রুশ হতাহতদের মধ্যে প্রায় ৬২ শতাংশই মারা যাচ্ছেন। এই মৃত্যুহার আগে যা ধারণা করা হয়েছিল তার চেয়ে অনেক বেশি, যা রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতা ও চিকিৎসা ব্যবস্থার নাজুক অবস্থাকেই ফুটিয়ে তুলছে।
মস্কো বর্তমানে পূর্ব ইউক্রেনের দোনেৎস্ক অঞ্চলটি পুরোপুরি দখলের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। এই অঞ্চলে ইউক্রেনের একটি শক্তিশালী ‘দুর্গ বলয়’ রয়েছে যা স্লোভিয়ানস্ক, ক্রামাতোরস্ক, কনস্তান্তিনিভকা এবং দ্রুঝকিভকা শহর নিয়ে গঠিত। ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর প্রধান ওলেক্সান্ডার সিরস্কি জানিয়েছেন যে এপ্রিল মাসে এই শহরগুলোকে লক্ষ্য করে রুশ হামলা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে কনস্তান্তিনিভকা শহরটি ঘিরে মস্কো বড় ধরনের অগ্রগতির দাবি করলেও আইএসডব্লিউ তা নাকচ করে দিয়েছে। স্যাটেলাইট চিত্র ও রণক্ষেত্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে থিঙ্কট্যাঙ্কটি জানিয়েছে যে রাশিয়া এই শহরের মাত্র ০.৭ শতাংশ এলাকায় খুব সামান্য অগ্রসর হতে পেরেছে এবং বাকি দাবিগুলো ভিত্তিহীন।
আইএসডব্লিউ-এর বিশ্লেষণে রাশিয়ার এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের কৌশলের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে যাকে তারা ‘কগনিটিভ ওয়ারফেয়ার’ বা বৌদ্ধিক যুদ্ধ বলে অভিহিত করেছে। তারা বলছে যে রুশ বাহিনী মূলত ‘ইনফিল্ট্রেশন ট্যাকটিকস’ বা অনুপ্রবেশের কৌশল ব্যবহার করে এমন একটি ধারণা তৈরি করতে চায় যেন তারা ক্রমাগত সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে অনেক এলাকায় তারা প্রবেশ করলেও সেখানে কোনো শক্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে তাদের সাফল্যকে বাড়িয়ে দেখানোর এই চেষ্টা মূলত বিশ্বের জনমতকে বিভ্রান্ত করার একটি কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইউক্রেনের জন্য এই সাফল্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ গত কয়েক মাস ধরে পশ্চিমাদের কাছ থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ পাওয়ার ক্ষেত্রে তারা অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। তবে এপ্রিলের এই রণকৌশলগত পরিবর্তন প্রমাণ করে যে ইউক্রেনীয় বাহিনী সীমিত সম্পদ নিয়েও রুশ অগ্রযাত্রাকে কেবল থামিয়েই দেয়নি বরং অনেক ক্ষেত্রে তাদের পিছু হঠতে বাধ্য করেছে। দোনেৎস্কের সেই ‘দুর্গ বলয়’ এখনো ইউক্রেনের হাতে অক্ষত থাকা রাশিয়ার জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। পুতিন সরকার যদি তাদের সৈন্য নিয়োগের হারের চেয়ে বেশি সংখ্যক সৈন্য হারাতে থাকে তবে সামনের মাসগুলোতে রুশ বাহিনী আরও সংকটে পড়বে বলে সামরিক বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন।
এপ্রিলে রাশিয়ার এই পরাজয় বা অগ্রযাত্রা থমকে যাওয়া কেবল সামরিক কোনো সংখ্যা নয় বরং এটি একটি কৌশলগত ইঙ্গিত। যুদ্ধের তৃতীয় বছরে এসে রাশিয়া যদি তাদের দখলের গতি ধরে রাখতে না পারে তবে ইউক্রেন বড় ধরনের পাল্টা আক্রমণের সুযোগ পেতে পারে। তবে যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি এবং সাময়িক কোনো সাফল্যই চূড়ান্ত বিজয় নিশ্চিত করে না। সামনের দিনগুলোতে রাশিয়ার ভিক্টরি ডে উদযাপনের কাটছাঁট করার খবরও মস্কোর ভেতরে থাকা উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইউক্রেনের মাটি থেকে রুশ আগ্রাসন হটিয়ে দেওয়ার লড়াইয়ে এপ্রিল মাসটি সম্ভবত একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।
