রবিবার, ১৭ মে, ২০২৬, ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

স্কটল্যান্ডে বন্য স্যামন সংকট: বিলুপ্তির মুখে ঐতিহ্যবাহী ঘিলি পেশা

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ১৬, ২০২৬, ০৫:৫৬ পিএম

স্কটল্যান্ডে বন্য স্যামন সংকট: বিলুপ্তির মুখে ঐতিহ্যবাহী ঘিলি পেশা

স্কটল্যান্ডের নদীগুলোতে বন্য আটলান্টিক স্যামন মাছের সংখ্যা নজিরবিহীনভাবে কমে যাওয়ায় দেশটির শত বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী ফিশিং গাইড বা ‘ঘিলি’ পেশা এখন সম্পূর্ণ বিলুপ্তির মুখে পড়েছে। সরকারি পরিসংখ্যানের বরাতে জানা গেছে, গত বছর স্কটিশ নদীগুলোতে বন্য স্যামন ধরার পরিমাণ ৪১ শতাংশ কমে মাত্র ২৮ হাজারে নেমে এসেছে। এই আকস্মিক স্কটল্যান্ডে বন্য স্যামন সংকট গ্রামীণ অর্থনীতি ও নদী অববাহিকার পরিবেশগত ভারসাম্যকে এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

পাঁচ বছরের গড় হিসাব অনুযায়ী, এই মাছের সংখ্যা আগের তুলনায় প্রায় ৬৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে প্রখ্যাত প্রকৃতিবিদ স্যার ডেভিড অ্যাটেনবোরো সতর্ক করেছেন যে আগামী দুই দশকের মধ্যে ব্রিটেন থেকে বন্য আটলান্টিক স্যামন চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে। এটি এমন একটি দেশের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক চিত্র, যেখানে পার্থ এবং বারউইক-আপন-টুইডের মতো আস্ত শহর গড়ে উঠেছিল এই স্যামন সমৃদ্ধ নদীগুলোর অববাহিকায়। রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা এই মাছ শিকারের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন এই ‘ঘিলি’ বা নদী রক্ষকেরা। গ্যালিক শব্দ থেকে আসা এই ঘিলিরা মূলত বংশপরম্পরায় নদীর মেজাজ, লুকানো পাথর এবং মাছের গতিপ্রকৃতি বুঝে অ্যাঙ্গলার বা শৌখিন মাছ শিকারিদের গাইড হিসেবে কাজ করতেন।

নদীতে মাছ কমে যাওয়ায় পর্যটকদের আগমন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে স্থানীয় হোটেল ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর। রিভার ডি-তে দীর্ঘ ৫০ বছর ঘিলি হিসেবে কাজ করা রবার্ট হার্পার তার অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করে বলেন, ১৯৭৮ সালের মার্চের শেষ দিকেও তারা একটি নির্দিষ্ট এলাকা থেকে ৪০০টি স্যামন ধরেছিলেন। অথচ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মে মাসের শেষ পর্যন্ত মাত্র হাতগোনা কয়েকটি মাছের দেখা মেলে। এই রাজস্ব ঘাটতির কারণে বড় বড় জমিদার বা ল্যান্ডেড এস্টেটগুলো এখন পুরনো ঘিলিরা অবসরে যাওয়ার পর নতুন করে কাউকে নিয়োগ দিচ্ছে না। ২০১৪ সালে যেখানে রিভার ডি-তে ৪০ জনের বেশি ঘিলি কর্মরত ছিলেন, ২০২৪ সালে তা কমে মাত্র ২২ জনে দাঁড়িয়েছে।

এই বিপর্যয়ের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি উপকূলীয় অঞ্চলে গড়ে ওঠা শিল্পায়িত ‘স্যামন ফার্মিং’ বা কৃত্রিম মাছ চাষকে প্রধানত দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। স্কটল্যান্ডের উপকূল জুড়ে খাঁচায় বার্ষিক প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার টন স্যামন উৎপাদন করা হয় সুপারমার্কেটগুলোর বাণিজ্যিক চাহিদা মেটানোর জন্য। এই শিল্পায়িত খামারগুলো মূলত ‘সী লাইস’ বা সামুদ্রিক উকুনের প্রজনন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, যা বিভিন্ন রোগ ছড়িয়ে বুনো স্যামনদের ধ্বংস করছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে বন্য মাছ শিকার যেখানে মাত্র ১০০ মিলিয়ন পাউন্ড অবদান রাখে, সেখানে কৃত্রিম মাছ চাষ শিল্প ১ বিলিয়ন পাউন্ডের বেশি যোগ করে।

অর্থনৈতিকভাবে কৃত্রিম চাষ শক্তিশালী হলেও পরিবেশবাদীদের মতে, ঘিলিরা কেবল গাইড ছিলেন না, তারা ছিলেন নদীর অতন্দ্র প্রহরী। বাণিজ্যিক লগিং বা খামার শিল্পের দূষণ থেকে নদীকে রক্ষা করতে তারা কয়েক দশক ধরে অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেছেন। নতুন প্রজন্মের যুবকেরা মাছের এই চরম সংকট দেখে এই পেশায় আসতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে, যা এই প্রাচীন জীবনযাত্রার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিচ্ছে।

কিছু অভিজ্ঞ মৎস্যজীবী এখনো আশা করেন যে সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় হয়তো আবার স্যামনের ঝাঁক ফিরে আসবে। তবে রবার্ট হার্পারের মতো প্রবীণদের মতে, এটি কেবল একটি চাকরি ছিল না, এটি ছিল একটি সম্পূর্ণ জীবনধারা যা এখন হারিয়ে যাচ্ছে।

banner
Link copied!