বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

পবিত্র ঈদুল আজহার তাৎপর্য ও কোরবানির প্রয়োজনীয় মাসালা

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ২০, ২০২৬, ১০:৪৮ পিএম

পবিত্র ঈদুল আজহার তাৎপর্য ও কোরবানির প্রয়োজনীয় মাসালা

আমাদের দেশে ঈদুল আজহা মূলত কোরবানির ঈদ হিসেবেই অধিক পরিচিত। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ভাষ্যমতে, এই কোরবানি হচ্ছে হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর সেই মহান সুন্নতের অনুসরণ। হজরত জায়েদ ইবনে আরকাম (রা.) বর্ণিত হাদিসে স্পষ্ট, সাহাবীদের প্রশ্নের উত্তরে রসুল (সা.) কোরবানিকে হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর সুন্নত হিসেবেই উল্লেখ করেছেন। পবিত্র আল কুরআনেও হজরত ইবরাহিম ও ইসমাইল (আ.)-এর সেই ঐতিহাসিক ত্যাগের ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।

কোরবানির মূল চেতনা নিহিত রয়েছে হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর পরম আনুগত্যে।

আল্লাহর নির্দেশ পালনের মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে তিনি মিনার নির্জন প্রান্তে উপস্থিত হয়েছিলেন। পুত্রের গলায় ছুরি চালানোর সেই কঠিন মুহূর্তটি কেবলই আল্লাহপ্রেমের চরম পরীক্ষার নিদর্শন ছিল। আল্লাহ তাআলা পিতা এবং পুত্রের এই অপরিসীম ত্যাগ ও ধৈর্যের পরীক্ষায় খুশি হয়ে হযরত ইসমাইল (আ.)-কে রক্ষা করেন এবং তার পরিবর্তে একটি মেষ বা দুম্বা কোরবানি হিসেবে কবুল করেন। এটিই সেই ত্যাগের মহান শিক্ষা যা আজও মুসলিম উম্মাহকে অনুপ্রাণিত করে।

রসুল (সা.) তার কন্যা ফাতিমা (রা.)-কে কোরবানির সময় উপস্থিত থাকতে উৎসাহিত করেছিলেন।

তিনি বলেছিলেন, কোরবানির পশুর শরীর থেকে প্রথম রক্তবিন্দু প্রবাহিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আল্লাহতায়ালা বান্দার সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেন। সাহাবীদের জিজ্ঞাসার উত্তরে তিনি আরও নিশ্চিত করেন যে, এই ফজিলত কেবল আহলে বাইতের জন্য নয় বরং সব মুসলিমের জন্য প্রযোজ্য। কোরবানির সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যারা এই ইবাদত পালনে অবহেলা করে, তাদের প্রতি রসুল (সা.) কঠিন সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন। তিনি সামর্থ্যবানদের ঈদগাহে না আসার নির্দেশ দিয়েছেন।

কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার শর্তাবলি এবং মাসালা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা প্রতিটি মুসলিমের জন্য জরুরি।

প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ মস্তিষ্কের নরনারীর কাছে যদি ১০ জিলহজ ফজর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত প্রয়োজনের অতিরিক্ত সাড়ে ৫২ তোলা রুপার সমপরিমাণ সম্পদ থাকে, তবেই কোরবানি ওয়াজিব হয়। এই নিসাব সারা বছর থাকা শর্ত নয়, বরং কেবল কোরবানির দিনগুলোতে থাকলেই চলে। তবে নাবালেগ সন্তান বা গরিব ব্যক্তির ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়। যদিও কেউ যদি কোরবানির নিয়তে পশু কেনে, তবে তা কোরবানি করা ওয়াজিব হয়ে দাঁড়ায়।

কোরবানি করা যায় জিলহজের ১০, ১১ ও ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত।

সম্ভব হলে ১০ তারিখেই কোরবানি করা উত্তম। উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা—এই গৃহপালিত পশুগুলো দ্বারাই কোরবানি জায়েজ। হরিণ বা বন্য গরুর মতো পশুতে কোরবানি গ্রহণযোগ্য নয়। উটের বয়স হতে হয় অন্তত পাঁচ বছর, গরু-মহিষের কমপক্ষে দুই বছর এবং ছাগল, ভেড়া বা দুম্বার বয়স হতে হয় এক বছর। তবে ভেড়া ও দুম্বা যদি এক বছরের কম বয়সেরও হয় কিন্তু হৃষ্টপুষ্ট এবং দেখতে এক বছরের মতো মনে হয়, তবে তা জায়েজ।

একটি ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা দ্বারা কেবল একজনই কোরবানি দিতে পারেন।

গরু, মহিষ বা উটে সর্বোচ্চ সাতজন ব্যক্তি শরিক হয়ে কোরবানি দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। যদি কেউ নির্দিষ্ট দিনগুলোর মধ্যে ওয়াজিব কোরবানি আদায় করতে না পারে, তবে পরে কোরবানির পশুর একটি ভাগের সমপরিমাণ মূল্য সদকা করে দেওয়া ওয়াজিব। ত্যাগের এই মহান ইবাদত যেন কেবল পশুর রক্ত প্রবাহিত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং অন্তরে আল্লাহর প্রতি প্রকৃত তাকওয়া অর্জন করাই এর আসল লক্ষ্য।

আল্লাহ আমাদের এই মহান সুন্নতের ওপর আমল করার তাওফিক দান করুন।

banner
Link copied!