হজ মুসলমানের জীবনে কেবল ইবাদত নয়, বরং আবেগ, আনন্দ ও গৌরবের একটি অনন্য মাইলফলক। তাই যুগে যুগে হাজিরা তাদের প্রেমময় এই হজযাত্রাকে নানাভাবে স্মরণীয় রাখার চেষ্টা করেছেন। শাসকরা যেমন মক্কা-মদিনায় স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেছেন, ধনীরা দুহাত খুলে দান করেছেন, তেমনি কবি-সাহিত্যিকরা হাতে তুলে নিয়েছেন কলম। অসংখ্য মুসলিম লেখক হজের স্মৃতি রোমন্থন করতে রচনা করেছেন সফরনামা। পৃথিবীর বিখ্যাত প্রায় সব ভাষাতেই হজের বিবরণ পাওয়া গেলেও আরবি ভাষায় রচিত সফরনামাগুলো ঐতিহাসিকভাবে সবচেয়ে সমৃদ্ধ।
আরবি ভাষায় রচিত এসব প্রাচীন সফরনামা শুধু হজপথের মানচিত্র নয়, বরং সমাজ ও সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
মুহাম্মদ ইবনে জুবায়ের ছিলেন মুসলিম স্পেনের বিখ্যাত পর্যটক ও সমাজতাত্ত্বিক। ৫৭৮ হিজরি মোতাবেক ১১৮৩ খ্রিস্টাব্দে হজ পালন করে তিনি ৫৮০ হিজরিতে রচনা করেন তার অমর গ্রন্থ ‘রিহলাতু ইবনে জুবায়ের’। এটি হজের প্রাচীনতম সফরনামাগুলোর মধ্যে অন্যতম। এ বইয়ে যাত্রাপথে অতিক্রম করা জনপদ, শহর ও শাসকদের বিশদ বিবরণ পাওয়া যায়। তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং মক্কা-মদিনার নিখুঁত চিত্র তুলে ধরার পাশাপাশি এর সাহিত্যমানও অসাধারণ।
মরক্কোর আলেম ইবনে রুশাইদ আল-ফিহরি ৬৮৪ হিজরি মোতাবেক ১২৮৫ খ্রিস্টাব্দে হজে যান। তার সফরনামাটির নাম দীর্ঘ হলেও এটি হজের শিক্ষামূলক দিকের একটি দলিল। তিনি ইলমে দ্বিন এবং হাদিস শাস্ত্রের জ্ঞানার্জনের জন্য বিভিন্ন শহরে আলেমদের সান্নিধ্য গ্রহণ করেছিলেন। তার সফরনামায় সমসাময়িক আলেমদের তালিকা, সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা ও শিক্ষাব্যবস্থার বিস্তারিত বর্ণনা ফুটে উঠেছে, যা তৎকালীন জ্ঞান-বিজ্ঞানের একটি ঐতিহাসিক দলিল।
কাসিম বিন ইউসুফ আস-সিবতি ৬৯০ হিজরির দিকে হজ সম্পন্ন করে লেখেন ‘মুস্তাফাদুর রিহলাতি ওয়াল ইগতিরাব’।
এই গ্রন্থে ভ্রমণের কষ্ট, বিচ্ছেদ এবং মক্কা-মদিনার প্রতি লেখকের ব্যক্তিগত আবেগ ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল ভাষায়। পর্যটক ইবনে বতুতার বিশ্বভ্রমণের অন্যতম অনুপ্রেরণাও ছিল তার প্রথম হজ সফর। ৭২৬ হিজরিতে তিনি প্রথম হজ করেন এবং তার বিখ্যাত ‘তুহফাতুন নাজ্জার’ গ্রন্থে হজযাত্রার বিবরণ তুলে ধরেন। ১০৭২ হিজরিতে আবদুল্লাহ বিন মুহাম্মদ আইয়াশির লেখা ‘রিহলাতুল আইয়াশি’ উত্তর আফ্রিকা থেকে হজে গমন পথের ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে সমাদৃত।
মিসরীয় লেখকদের অবদানও এই ক্ষেত্রে অপরিসীম।
২০ হিজরি থেকেই মিসর থেকে নিয়মিত হজ কাফেলা বের হতো এবং ফুসতাস শহরে সমবেত হতো। আধুনিক যুগে এসে ড. মুহাম্মদ হুসাইন হাইকলের ‘ফি মানজিলিল ওহি’, আয়েশা আবদুর রহমানের ‘আরদুল মুজিঝাতি’, মুহাম্মদ লাবিব বাত্তানির ‘আল-রিহলাতুল হিজাজিয়্যা’ এবং মুহাম্মদ রশিদ রেজার ‘রিহলাতুল হিজাজ’ আরবি ভাষায় হজের সফরনামাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ইবরাহিম রাফআত পাশার ‘মিরাতুল হারামাইন’ বইটিতে তৎকালীন হজ ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোর নিঁখুত বর্ণনা পাওয়া যায়।
এসব গ্রন্থ নিছক ভ্রমণকাহিনী নয়।
এগুলো তৎকালীন সময়ের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির আয়না। প্রতিটি সফরনামায় লেখকদের হূদয়ের আবেগ, বিশ্বাসের গভীরতা এবং আল্লাহর ঘরের প্রতি তীব্র আকুলতা প্রকাশ পেয়েছে। বর্তমান যুগেও এসব বই আমাদের ইসলামের ইতিহাস ও ভূগোলের সঙ্গে পরিচিত হতে সাহায্য করে। মহান রাব্বুল আলামিন সব লেখকের আবেগ ও ভালোবাসাকে কবুল করুন এবং আমাদেরকেও তাঁদের জ্ঞানভাণ্ডার থেকে উপকৃত হওয়ার তাওফিক দান করুন।
