বুধবার, ২৭ মে, ২০২৬, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

তিন ভাগ না করলে কি গুনাহ হবে? কুরবানির মাংস বণ্টনের নিয়ম

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ২৭, ২০২৬, ০৪:৪১ পিএম

তিন ভাগ না করলে কি গুনাহ হবে? কুরবানির মাংস বণ্টনের নিয়ম

পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে পশু কোরবানির পর মাংস বণ্টন নিয়ে বাংলাদেশের মুসলিম সমাজে নানা ধরনের সামাজিক রীতি ও প্রচলিত ধারণা দেখা যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ এবং বহুল আলোচিত বিষয়টি হলো সংগৃহীত পশুর মাংস সমান তিন ভাগে ভাগ করা। সাধারণত মনে করা হয় যে এক ভাগ কোরবানিদাতার নিজের পরিবারের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের জন্য এবং বাকি এক ভাগ সমাজের দরিদ্র মানুষের মাঝে বিতরণ করা আবশ্যক।তবে তিন ভাগ না করলে কোনো গুনাহ হবে কি না, তা নিয়ে আলেমদের স্পষ্ট ব্যাখ্যা রয়েছে।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিচালক মুফতি আনিসুর রহমান সিকদার এ বিষয়ে জানিয়েছেন যে কুরবানির মাংস তিন ভাগে বণ্টন করার বিষয়টি মূলত হাদিস দ্বারা সমর্থিত এবং এটি একটি উত্তম আমল হিসেবে বিবেচিত। তবে এটি ইসলামের কোনো বাধ্যতামূলক বা অলঙ্ঘনীয় আইনি বিধান নয়। কোনো ব্যক্তি যদি বিশেষ কোনো পরিস্থিতির কারণে বা নিজের পরিবারের প্রয়োজনের তাগিদে পুরো মাংস নিজে রেখে দেন, তবে তার কোরবানি বাতিল হবে না এবং কোনো গুনাহও হবে না। একইভাবে কেউ চাইলে তার পশুর সম্পূর্ণ মাংসই আল্লাহর ওয়াস্তে গরিবদের মাঝে দান করে দিতে পারেন।

মাংস বণ্টনের এই নির্দেশনার মূল ভিত্তি রয়েছে পবিত্র কোরআনে। সূরা হজের ২৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে তোমরা তা থেকে নিজেরা আহার করো এবং দুস্থ ও অভাবীদের খাওয়াও। এছাড়া রাসুলুল্লাহ (সা.) কোরবানি শেষে মাংসের একটি অংশ নিজের ঘরের জন্য রাখতেন, একটি অংশ উপহার হিসেবে প্রতিবেশীদের পাঠাতেন এবং অবশিষ্টাংশ দরিদ্রদের মাঝে বিলিয়ে দিতেন। আল্লাহর নবীর এই ধারাবাহিক আমল থেকেই মূলত মুসলিম সমাজে তিন ভাগের প্রথাটি একটি জনপ্রিয় সংস্কৃতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

বাংলাদেশের গ্রামীণ ও শহরতলির সমাজব্যবস্থায় আবার ‍‍`সামাজিক ভাগ‍‍` নামে একটি ভিন্নধর্মী বণ্টন ব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে। এই নিয়মে কোরবানিদাতারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের পশুর মাংসের একটি নির্দিষ্ট অংশ স্থানীয় সমাজ বা মাতব্বরদের মাধ্যমে গ্রামের গরিব মানুষের জন্য জমা দেন। ধর্মীয় গবেষকদের মতে, এই যৌথ উদ্যোগটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও মানবিক, যদি তা সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় সম্পন্ন হয়। কিন্তু কোনো এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তি বা সামাজিক কমিটি যদি কোরবানিদাতাকে নির্দিষ্ট পরিমাণ মাংস দিতে বাধ্য করে বা চাপ সৃষ্টি করে, তবে তা ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অবৈধ ও অগ্রহণযোগ্য বলে গণ্য হবে।

প্রকৃতপক্ষে কোরবানির মূল উদ্দেশ্য বাহ্যিক মাংসের পরিমাণ বা বণ্টনের কাঠামোর ওপর নির্ভর করে না, বরং এর মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও মনের তাকওয়া প্রকাশ করা। পবিত্র কোরআনের সূরা হজের ৩৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে যে আল্লাহর কাছে কোরবানির পশুর রক্ত বা মাংস পৌঁছায় না, বরং পৌঁছায় বান্দার তাকওয়া বা খোদাভীতি। অতএব মাংস তিন ভাগ করার উত্তম আদর্শ অনুসরণের পাশাপাশি কোরবানিদাতার নিয়তের আন্তরিকতা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখাই সবচেয়ে জরুরি বিষয়।

banner
Link copied!