ইসলামি শরিয়তের নিয়ম অনুযায়ী পবিত্র জিলহজ মাসের চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করেই প্রতি বছর মুসলিম উম্মাহর অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ উদযাপনের দিন নির্ধারিত হয়। ভৌগোলিক অবস্থান ও সময় অঞ্চলের পার্থক্যের কারণে পৃথিবীর সব দেশে একই রাতে নতুন চাঁদ দৃশ্যমান হয় না, যার ফলে বিভিন্ন অঞ্চলে ঈদের তারিখে ভিন্নতা দেখা দেয়। তবে এবার এই ঐতিহাসিক ব্যতিক্রমী ঘটনাটি ঘটেছে খোদ দক্ষিণ এশিয়ার ভৌগোলিক সীমানার ভেতরেই, যা সাধারণ মুসলিম সমাজকে বেশ চমকিত করেছে।
উপমহাদেশের তিন প্রতিবেশী দেশ এবার এক দিনে ঈদ করছে না।
গত রোববার (১৭ মে) করাচিতে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় রুয়েত-ই-হিলাল কমিটির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কমিটির চেয়ারম্যান মাওলানা আব্দুল খবির আজাদের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই বৈঠকে দেশের আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং মহাকাশ গবেষণা সংস্থা সুুপারকো-র শীর্ষ স্তরের বিজ্ঞানীরা উপস্থিত ছিলেন। দীর্ঘ পর্যালোচনার পর কমিটি পাকিস্তানে জিলহজ মাসের চাঁদ দেখার বিষয়টি নিশ্চিত করে এবং আগামী ২৭ মে (বুধবার) দেশটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপনের ঘোষণা দেয়। এই সিদ্ধান্তের ফলে পাকিস্তান এবার সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমানসহ সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে একই দিনে কোরবানির ঈদ উদযাপন করবে।
এর বিপরীতে ভারত ও বাংলাদেশে জিলহজ মাসের নতুন চাঁদ দেখতে পাওয়ার কোনো নির্ভরযোগ্য খবর মেলেনি। দিল্লির কেন্দ্রীয় রুয়েত-এ-হিলাল কমিটি জানিয়েছে যে দেশের কোথাও চাঁদ না দেখায় তারা ১৯ মে থেকে জিলহজ মাস গণনা শুরু করবে এবং সেই অনুযায়ী আগামী ২৮ মে (বৃহস্পতিবার) ভারতে ঈদ পালিত হবে। বাংলাদেশেও জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির পক্ষ থেকে আজ সন্ধ্যায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে যাচ্ছে, যেখানে চাঁদ না দেখার কারণে আগামী ২৮ মে ঈদুল আজহা উদযাপনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হবে। এর ফলে একই উপমহাদেশে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তানের চেয়ে একদিন পরে ঈদ উদযাপন করবে বাংলাদেশ ও ভারত।
একই অঞ্চলে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও এই পার্থক্যের পেছনে নিখুঁত বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে।
মহাকাশ বিজ্ঞানের পরিভাষায় নতুন চাঁদের দৃশ্যমানতা মূলত তার নির্দিষ্ট বয়স, উচ্চতা এবং সূর্যের অবস্থানের ওপর সরাসরি নির্ভর করে, যাকে গবেষকরা ভিজিবিলিটি কার্ভ বা দৃশ্যমানতার রেখা বলে অভিহিত করেন। সূর্যাস্তের সময় বাংলাদেশের আকাশে চাঁদের বয়স খালি চোখে দেখার উপযোগী না হলেও সময়ের ব্যবধানে এক থেকে দেড় ঘণ্টা পর পাকিস্তানের ভৌগোলিক আকাশে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এছাড়া পাকিস্তান সরকার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের চাঁদ দেখা কমিটিতে আধুনিক মহাকাশ বিজ্ঞানীদের অন্তর্ভুক্ত করায় তারা বৈশ্বিক মানদণ্ড বিশ্লেষণ করে দ্রুত এবং নিখুঁত সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ও ভারত এখনো মূলত খালি চোখে প্রথানুগত চাঁদ দেখার পদ্ধতিকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে।
ইতিহাসের পাতায় এই ধরনের আঞ্চলিক ভিন্নতা খুব একটা নিয়মিত দেখা যায় না। অতীতে পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া বা নির্দিষ্ট কিছু সীমান্ত অঞ্চল সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে ঈদ পালন করলেও কেন্দ্রীয়ভাবে পুরো দেশে এমন ঘোষণা সাম্প্রতিক দেড় দশকে দেখা যায়নি। মহাকাশীয় নিয়মের কারণে প্রতি ১০ থেকে ১৫ বছরে অন্তত একবার এমন বিরল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, এবার ২০২৬ সালে এসে ঠিক সেটিই বাস্তবায়িত হয়েছে। তারিখের এই তফাত থাকলেও বিশ্ব মুসলিমের ত্যাগের মহিমা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মূল চেতনাটি একই সূত্রে গাঁথা রয়েছে।
