ইসলামি শরিয়তে কোরবানি কেবল একটি নির্দিষ্ট পশু জবাই করার বাহ্যিক সামাজিক আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি মূলত মহান আল্লাহর প্রতি বান্দার নিঃশর্ত আনুগত্য, গভীর তাকওয়া এবং নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দেওয়ার এক মহিমান্বিত ইবাদত। প্রতি বছর পবিত্র জিলহজ মাসে বিশ্বজুড়ে সামর্থ্যবান মুসলমানরা আল্লাহর বিশেষ নৈকট্য ও সান্নিধ্য লাভের আশায় এই পবিত্র দায়িত্বটি পালন করে থাকেন।
এই মহান ইবাদতের পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ ও ঐতিহাসিক ত্যাগের পটভূমি।
আরবি ‘কুরবান’ শব্দ থেকে কোরবানি শব্দের উৎপত্তি, যার মূল অর্থই হলো আল্লাহর কাছাকাছি হওয়া বা সান্নিধ্য অর্জন করা। পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে, যেমন সুরা কাওসার, সুরা আনআম এবং সুরা হজে এই বিধানের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। মানব সভ্যতার সূচনা লগ্ন থেকেই প্রতিটি ইসলামি শরিয়তে কোনো না কোনো উপায়ে কোরবানির নিয়ম চালু ছিল। ইতিহাসের প্রথম কোরবানি অনুষ্ঠিত হয়েছিল আদি পিতা আদম আলাইহিস সালামের দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের মাধ্যমে, যেখানে আল্লাহ কেবল নিয়তের পবিত্রতার কারণে হাবিলের কোরবানি কবুল করেছিলেন।
বর্তমানে প্রচলিত কোরবানির মূল ভিত্তিটি মূলত গড়ে উঠেছে হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ও তাঁর প্রিয় পুত্র ইসমাইল আলাইহিস সালামের এক কঠিনতম পরীক্ষার ওপর। দীর্ঘ দিন নিঃসন্তান থাকার পর বৃদ্ধ বয়সে আল্লাহর উপহার হিসেবে পাওয়া একমাত্র পুত্রকে স্বপ্নে কোরবানি করতে দেখে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম দ্বিধাহীনভাবে আল্লাহর হুকুম পালনে প্রস্তুত হন। পিতার মুখে আল্লাহর এই আদেশের কথা শুনে কিশোর পুত্র ইসমাইল আলাইহিস সালাম অত্যন্ত বিনয়ের সাথে নিজেকে বিলিয়ে দিতে রাজি হয়েছিলেন। পিতা ও পুত্রের এই অনন্য সাধারণ ও ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণ দেখে আল্লাহ খুশি হয়ে জান্নাত থেকে একটি দুম্বা পাঠিয়ে ইসমাইল আলাইহিস সালামকে মুক্ত করেন এবং এই ত্যাগকে কিয়ামত পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহর জন্য ‘সুন্নতে ইবরাহিমি’ হিসেবে জারি রাখেন।
পশুর রক্ত বা গোশত কখনোই আল্লাহর দরবারে পৌঁছায় না।
পবিত্র কুরআনের সুরা হজের ৩৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে পশুর রক্ত কিংবা গোশত আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, বরং তাঁর কাছে পৌঁছায় বান্দার ভেতরের তাকওয়া বা খোদাভীতি। অর্থাৎ পশু জবাইয়ের মাধ্যমে একজন মুমিন আসলে তার নিজের ভেতরের পশুত্ব, অহংকার, লোভ ও আত্মকেন্দ্রিক প্রবৃত্তিকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিসর্জন দেয়। মদিনার জীবনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দীর্ঘ দশ বছর অবস্থানকালে প্রতি বছর নিয়মিত কোরবানি আদায় করেছেন এবং সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যারা এই আমল থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাদের ব্যাপারে হাদিসে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয়েছে।
ব্যক্তিগত আত্মশুদ্ধির পাশাপাশি কোরবানির একটি বিশাল মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক শিক্ষাও রয়েছে। শরিয়তের নিয়ম অনুযায়ী কোরবানির গোশত নিজের জন্য রাখার পাশাপাশি দরিদ্র, অনাহারী এবং আত্মীয়-স্বজনদের মাঝে বিলিয়ে দেওয়া মুমিনদের অন্যতম প্রধান সামাজিক দায়িত্ব। এই নিয়মটি সমাজে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব, সহমর্মিতা ও ভেদাভেদহীন এক মানবিক মেলবন্ধন তৈরি করে। তাই লোকদেখানো অহংকার বা নিছক গোশত খাওয়ার উৎসব মনে না করে বিশুদ্ধ নিয়তে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে নিজেকে উৎসর্গ করাই হোক কোরবানির মূল অঙ্গীকার।
