পবিত্র জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিন মুসলিম উম্মাহর জন্য আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এক অনন্য ও মহিমান্বিত উপহার। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় এই দিনগুলো হলো আত্মশুদ্ধি, ইবাদত, তাওবা এবং মহান স্রষ্টার বিশেষ তাকওয়া অর্জনের এক বসন্তকাল। আল্লাহর কাছে বান্দার নেক আমল ও ইবাদত পৌঁছানোর জন্য বছরের অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় এই দিনগুলোর গুরুত্ব অনেক বেশি।
চলতি ২০২৬ সালের জিলহজ মাসের চাঁদ দেখার সম্ভাবনা রয়েছে আজ সোমবার রাতেই।
পবিত্র কুরআনের সুরা তাওবার ৩৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টির সূচনা লগ্ন থেকে যে বারোটি মাস নির্ধারণ করেছেন, তার মধ্যে চারটি মাসকে বিশেষভাবে সম্মানিত ঘোষণা করেছেন। সহিহ বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, এই চার মাসের অন্যতম হলো জিলহজ মাস। এই মাসের প্রথম দশটি দিন এতটাই মর্যাদাপূর্ণ যে, স্বয়ং মহান আল্লাহ তাআলা সুরা ফাজরের শুরুতে এই দশ রাতের কসম বা শপথ খেয়েছেন। বিখ্যাত সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস এবং তাবেঈ ইমাম মুজাহিদসহ প্রথম সারির মুফাসসিরদের মতে, কুরআনে উল্লিখিত এই দশ রাত মূলত জিলহজের প্রথম দশ দিন ও রাতকে নির্দেশ করে।
জিলহজের প্রথম দশকের ফজিলত
আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, জিলহজের প্রথম দশকের আমলের চেয়ে অধিক মহৎ এবং আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় অন্য কোনো দিনের আমল নেই। এই দিনগুলোতে ইবাদতের সওয়াব বহুগুণ বৃদ্ধি পায়, কারণ এই এক দশকের মধ্যেই ইসলামের প্রধান প্রধান সব ইবাদতের এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে। এই দিনগুলোতে একদিকে যেমন নামাজের মতো দৈনিক ইবাদত রয়েছে, তেমনি অন্যদিকে কোরবানি, যাকাত এবং ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ পবিত্র হজের মতো বৃহৎ ইবাদতগুলো একই সময়ে সম্পন্ন করার সুযোগ তৈরি হয়। বছরের অন্য কোনো মাসে ইবাদতের এমন বৈচিত্র্যময় ও মহৎ সমাবেশ আর কোথাও দেখা যায় না।
পবিত্র মক্কার আরাফাত ময়দানে হাজিদের সমবেত হওয়ার দিনটি এই দশকের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। শরিয়তের বিধানে আরাফার দিনটি হলো জাহান্নাম থেকে মুক্তি এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে সাধারণ ক্ষমার এক মহাসুযোগ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আরাফার দিনের মতো আর কোনো দিন আল্লাহ এত বিপুলসংখ্যক মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন না। এই মহিমান্বিত দিনগুলোতে ঘরে বসে থাকা সাধারণ মুসলমানদের জন্যও এক বিশাল আধ্যাত্মিক কল্যাণ অর্জনের পথ উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে।
এই দশকের প্রতিটি মুহূর্তই মুমিনের জন্য মহামূল্যবান সম্পদ।
প্রথম দশকের ১০টি বিশেষ আমল
এই বরকতময় দিনগুলোকে আমলে প্রাণবন্ত রাখতে সুনির্দিষ্ট ১০টি বিশেষ আমল করার কথা ইসলামি শরিয়তে বিশেষভাবে নির্দেশিত হয়েছে। প্রথম আমল হলো চাঁদ ওঠার পর থেকে জিলহজ মাসের প্রথম দিনগুলোতে বেশি বেশি জিকির, তাসবিহ এবং তাওবা করা। মুসনাদে আহমাদের সহিহ হাদিস অনুযায়ী, এই দিনগুলোতে আল্লাহর তাসবিহ হিসেবে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’, ‘আল্লাহু আকবার’ এবং ‘আলহামদু লিল্লাহ’ পড়ার বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে। দ্বিতীয় আমল হলো, যারা কোরবানি করার নিয়ত করেছেন তারা জিলহজের চাঁদ দেখার পর থেকে নিজের কোরবানি সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত শরীরের নখ, চুল, গোঁফ বা অবাঞ্ছিত পশম কাটা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকবেন। এটি হাজিদের ইহরামের অবস্থার সাথে একটি প্রতীকী সাদৃশ্য তৈরি করে, যা সহিহ মুসলিমের হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
তৃতীয় আমল হিসেবে জিলহজের প্রথম নয় দিন নিয়মিত নফল রোজা রাখার কথা ফোকাহায়ে কেরাম উল্লেখ করেছেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দিনগুলোতে রোজা রাখতেন বলে সুনানে আবু দাউদের বর্ণনায় এসেছে। তবে চতুর্থ আমলটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো জিলহজ মাসের ৯ তারিখে অর্থাৎ আরাফার দিনে বিশেষভাবে রোজা রাখা। সহিহ মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী, আরাফার দিনের একটি রোজার বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা বান্দার পূর্ববর্তী এক বছর এবং পরবর্তী এক বছরের ছোট গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন। পঞ্চম আমল হিসেবে এই দিনগুলোতে বেশি বেশি জাহান্নাম থেকে মুক্তি এবং আল্লাহর রহমতের দোয়া করতে হবে।
ষষ্ঠ আমল হলো আরাফার দিনের বিশেষ দোয়া পাঠ করা, যা নবীজি এবং তাঁর পূর্ববর্তী সব নবীদের প্রিয় দোয়া ছিল। দোয়াটি হলো—‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির।’ সপ্তম আমল হলো সামর্থ্যবানদের জন্য হজ ও ওমরাহ সম্পাদন করা, যা এই দশকের সর্বশ্রেষ্ঠ শারীরিক ও আর্থিক ইবাদত। অষ্টম আমল হলো জিলহজ মাসের ৯ তারিখ ফজর থেকে শুরু করে ১৩ তারিখ আসর পর্যন্ত মোট ২৩ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পর উচ্চস্বরে একবার ‘তাকবিরে তাশরিক’ পাঠ করা। এই তাকবিরটি হলো—‘আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়ালিল্লাহিল হামদ।’
নবম আমল হলো জিলহজের ১০ তারিখে সামর্থ্যবান প্রত্যেক মুসলিমের জন্য মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পশু কোরবানি করা, যা একটি অন্যতম ওয়াজিব ইবাদত। সর্বশেষ বা দশম আমল হলো ঈদের দিন সকালে পরিচ্ছন্ন হয়ে জামাতের সাথে ঈদুল আজহার ওয়াজিব নামাজ আদায় করা। লোকদেখানো মানসিকতা পরিহার করে সম্পূর্ণ খাঁটি নিয়তে এই আমলগুলো করার মাধ্যমেই কেবল জিলহজ মাসের আসল বরকত অর্জন সম্ভব।
