বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

জিলহজে রোজা রাখতে না পারলে নারীদের সওয়াব পাওয়ার উপায়

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ১৯, ২০২৬, ০৬:২৬ পিএম

জিলহজে রোজা রাখতে না পারলে নারীদের সওয়াব পাওয়ার উপায়

ইসলামিক ক্যালেন্ডারের অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ও বরকতময় সময় জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিন বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর জন্য বছরের শ্রেষ্ঠ সময় হিসেবে বিবেচিত। এই দিনগুলোতে নেক আমলের সওয়াব অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বহুগুণ বেশি বলে হাদিসের বিশুদ্ধ বর্ণনায় প্রমাণিত। তবে অনেক মুসলিম নারী হায়েয, নেফাস, গর্ভাবস্থা কিংবা দুগ্ধদানের মতো স্বাভাবিক শারীরিক ওজরের কারণে এই দিনগুলোতে প্রথাগত রোজা রাখতে পারেন না, যা তাদের মনে এক ধরণের আক্ষেপ ও সওয়াব থেকে বঞ্চিত হওয়ার দুঃখ তৈরি করে।

ইসলামি শরিয়তের স্পষ্ট দলিল ও ফিকহবিদদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই ওজরের কারণে নারীদের মন খারাপ করার কোনো কারণ নেই।

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন যে, জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনের আমলের চেয়ে অন্য কোনো দিনের আমলই আল্লাহর কাছে বেশি উত্তম নয় (সহিহ বুখারি: ৯৬৩)। এমনকি মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনের সূরা ফজরের শুরুতে এই দশ রাতের কসম খেয়ে এর গুরুত্ব ও মর্যাদা ফুটিয়ে তুলেছেন। ইসলাম নারীর স্বাভাবিক শারীরিক অবস্থাকে বিবেচনা করেই তার বিধান প্রণয়ন করেছে, তাই হায়েয বা নেফাস অবস্থায় রোজা ও নামাজ থেকে বিরত থাকাও মূলত আল্লাহর হুকুম মানারই একটি অংশ। সহিহ বুখারির ২৯৯৬ নম্বর হাদিস অনুযায়ী, কোনো বান্দা যখন অসুস্থতা বা ওজরের কারণে কোনো আমল করতে পারে না, তখন সে সুস্থ অবস্থায় যে আমল করত, আল্লাহ তাআলা তার নিয়তের কারণে তাকে হুবহু সেই সওয়াবই দান করেন।

রোজা ও নামাজ ছাড়াও এই পবিত্র দিনগুলোতে নারীদের জন্য সওয়াব অর্জনের বহু ইবাদতের দরজা উন্মুক্ত রয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো বেশি বেশি জিকির, তাকবির ও তাহমিদ পাঠ করা। মুসনাদ আহমাদের ৫৪৪৬ নম্বর হাদিস অনুযায়ী, এই দিনগুলোতে বেশি বেশি সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং আল্লাহু আকবার পাঠ করার বিশেষ নির্দেশ রয়েছে। নারীরা ঘরের দৈনন্দিন কাজের ফাঁকে, চলাফেরায় বা যেকোনো সময় মুখে মুখে এই জিকির ও তাকবিরে তাশরিক আদায় করতে পারেন। এছাড়া জিলহজ মাসের ৯ তারিখ অর্থাৎ আরাফার দিনটি বছরের সর্বোত্তম দিন হওয়ায়, এই দিনে হায়েয অবস্থায়ও নারীরা দীর্ঘক্ষণ ইস্তেগফার ও দোয়া কবুলের শ্রেষ্ঠ মুহূর্তে মোনাজাতে মশগুল থাকতে পারেন (জামে তিরমিজি: ৩৫৮৫)।

পবিত্র কুরআন স্পর্শ করে তিলাওয়াত করা নিষিদ্ধ হলেও, ডিজিটাল মাধ্যম বা মোবাইলের স্ক্রিন দেখে অর্থ ও তাফসির পাঠ করা এবং মনোযোগ দিয়ে কুরআন শ্রবণ করার ক্ষেত্রে আলেমদের ব্যাপক ঐকমত্য রয়েছে। একই সঙ্গে এই ফজিলতপূর্ণ দিনগুলোতে সামর্থ্য অনুযায়ী সামান্য হলেও দান-সদকা করা এবং পরিবারের যারা রোজা রাখছেন, তাদের জন্য সাহরি ও ইফতার প্রস্তুত করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। জামে তিরমিজির ৮০৭ নম্বর হাদিস অনুযায়ী, যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, সে ওই রোজাদারের সমপরিমাণ সওয়াব পাবে, অথচ মূল রোজাদারের সওয়াব থেকে কিছুই কমানো হবে না। পরিবারের সদস্যদের নেক কাজে উৎসাহিত করা এবং কোরবানির প্রস্তুতিতে সহায়তা করাও গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হিসেবে গণ্য।

যারা কোরবানি দেওয়ার নিয়ত করেছেন, তাদের জন্য জিলহজের চাঁদ দেখার পর থেকে পশু কোরবানি হওয়া পর্যন্ত চুল, নখ, গোঁফ বা চামড়া না কাটা মোস্তাহাব এবং এই আমলটি ঋতুস্রাব অবস্থায় থাকা নারীরাও সমানভাবে পালন করতে পারেন (সহিহ মুসলিম: ১৯৭৭)। এটি রোজার সাথে সম্পর্কিত নয়, বরং কোরবানির আধ্যাত্মিক সওয়াবের অংশীদার হওয়ার একটি মাধ্যম। গর্ভাবস্থা বা দুগ্ধদানের কারণে যদি মা ও শিশুর স্বাস্থ্যের ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তবে ইসলাম তাদের রোজা না রাখার অনুমতি দিয়েছে, যা পরবর্তীতে কাজা করে নিতে হবে। সুতরাং, বাহ্যিক ইবাদত বন্ধ থাকলেও মন ও মুখের জিকিরের মাধ্যমে জিলহজের এই পবিত্র সময়কে আল্লাহর আনুগত্যে কাজে লাগানোই একজন সচেতন মুমিন নারীর মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

banner
Link copied!