আফ্রিকা মহাদেশের দক্ষিণ অঞ্চলের অন্যতম ক্ষুদ্র ও স্থলবেষ্টিত রাষ্ট্র কিংডম অব এসওয়াতানিতে (সাবেক সোয়াজিল্যান্ড) খ্রিস্টধর্মের একচ্ছত্র আধিপত্যের মাঝেও অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে বিকশিত হচ্ছে সংখ্যালঘু মুসলিম সমাজ। দক্ষিণ আফ্রিকা ও মোজাম্বিক সীমান্ত পরিবেষ্টিত প্রায় ১২ লাখ জনসংখ্যার এই সাভানা বনাঞ্চল ও পাহাড়ি দেশে বর্তমানে মোট জনসংখ্যার ২ থেকে ৩ শতাংশ মানুষ ইসলাম ধর্মের অনুসারী। প্রামাণ্য ঐতিহাসিক তথ্যের অভাবের কারণে এই অঞ্চলের সামগ্রিক মুসলিম জনসংখ্যা নিয়ে কিছুটা অস্পষ্টতা থাকলেও বর্তমানে প্রায় ২২ হাজার সুন্নি মুসলমান এই দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।
ঔপনিবেশিক শাসন আমল থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত এসওয়াতানিতে ইসলাম প্রচার ও প্রসারের ইতিহাস অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়।
যদিও প্রাচীনকাল থেকেই এই অঞ্চলে সুনির্দিষ্ট মানববসতির প্রমাণ মেলে এবং অষ্টম শতকের দিকে আরব মুসলিম বণিকেরা মোজাম্বিক উপকূল ধরে যাতায়াত করতেন, তবে এসওয়াতানির মূল ভূখণ্ডে ইসলামের স্থায়ী ভিত্তি তৈরি হয়েছিল মূলত বিংশ শতাব্দীর শুরুতে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে ভারতের গুজরাত অঞ্চল থেকে একদল ধনী মুসলিম ব্যবসায়ী প্রতিবেশী দক্ষিণ আফ্রিকা হয়ে সোয়াজিল্যান্ডে আগমন করেন। পরবর্তীতে তাদের সাথে যুক্ত হয় বেশ কিছু পাকিস্তানি ব্যবসায়ী পরিবার এবং ১৯০৭ সালের বিশেষ ব্রিটিশ আইনের অধীনে তারা এই দেশে স্থায়ীভাবে বাণিজ্যের অনুমতি লাভ করে। প্রাথমিক পর্যায়ে এই ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমরা কেবল নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্যের মধ্যেই কর্মকাণ্ড সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন এবং প্রকাশ্য দাওয়াতি কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন না।
তবে ১৯৬০-এর দশকে এই মুসলিম সমাজের কাঠামোতে বড় ধরণের পরিবর্তন আসে যখন মালাউই থেকে আসা মুসলিম খনি শ্রমিকদের একটি বিশাল দল এডিএইচডি বা এসবেসটস খনিতে কাজ করতে এই দেশে আগমন করে। ১৯৬৮ সালে ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৭২ সালে দেশটির রাজা ইসলাম ধর্মকে আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান করেন, যার ফলে মুসলমানেরা রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের আইনি অধিকার পায়। এর ঠিক ছয় বছর পর ১৯৭৮ সালে রাজধানী এমবাবানির নিকটবর্তী ইজুলউনি গ্রামে দেশটির সর্বপ্রথম আনুষ্ঠানিক জামে মসজিদ নির্মিত হয়, যা ৩ শ মুসল্লি ধারণক্ষমতা সম্পন্ন হলেও সে সময় প্রায় ১২ শ মুসলিমকে ধর্মীয়ভাবে ঐক্যবদ্ধ করেছিল।
পরবর্তীতে ১৯৮২ সালে মালুঙ্গে এলাকায় আরেকটি মসজিদ ও মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয় যা স্থানীয় শিশুদের প্রাথমিক ধর্মীয় শিক্ষা প্রদানে ভূমিকা রাখতে শুরু করে। ১৯৯৫ সালে `ইসলামিক ইয়ুথ অর্গানাইজেশন অব সোয়াজিল্যান্ড` প্রতিষ্ঠার পর দেশটির মুসলিম সমাজ সমাজকল্যাণমূলক কাজে ব্যাপকভাবে আত্মনিয়োগ করে এবং তাদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় ২০০৩ সালে প্রথম বিশেষায়িত ইসলামিক স্কুল গড়ে ওঠে। বর্তমানে সমগ্র এসওয়াতানিতে ৯টি কার্যকর মসজিদ রয়েছে, যা একই সাথে মক্তব হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং যেখানে শিশুরা কোরআন তিলাওয়াত, প্রাথমিক আরবি ভাষা ও দ্বীনি বিধানগুলো শিখতে পারছে।
বর্তমানে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কাঠামোর কারণে সেখানে প্রকাশ্য দাওয়াতি কার্যক্রমের পরিবর্তে মূলত ব্যক্তিগত ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমেই ইসলাম প্রচারের কাজ পরিচালিত হচ্ছে। একই সঙ্গে স্থানীয় সোয়াজি জনগোষ্ঠীর সাথে আন্তঃধর্মীয় বিয়ের প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় একদিকে যেমন ইসলামে ধর্মান্তরের হার বাড়ছে, অন্যদিকে উপযুক্ত ইসলামী শিক্ষার অভাবে অনেকে ধর্ম বিসর্জনও দিচ্ছেন। ল্যাবরেটরি বা কোনো আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই কেবল প্রবাসীদের ব্যক্তিগত নৈতিকতা ও মসজিদভিত্তিক মক্তব শিক্ষার ওপর ভিত্তি করে আফ্রিকার এই ক্ষুদ্রতম দেশে ইসলামের এই অগ্রযাত্রা আজও অব্যাহত রয়েছে।
