বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

বিশ্বজয়ের ৬০ বছর: আকাশে উড়ে ইতিহাস গড়া এক নারী বৈমানিক

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ২০, ২০২৬, ০৩:৫৮ পিএম

বিশ্বজয়ের ৬০ বছর: আকাশে উড়ে ইতিহাস গড়া এক নারী বৈমানিক

বিংশ শতাব্দীর মহান নারী বৈমানিকদের কথা উঠলে সাধারণত দুটি নাম সবার আগে আসে। আমেরিকার অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট এবং ইংল্যান্ডের অ্যামি জনসনের নাম প্রায়ই উচ্চারিত হয়। ১৯৩০ সালে লন্ডন থেকে অস্ট্রেলিয়ায় একা উড়ে গিয়ে ইতিহাস গড়েছিলেন জনসন। ইয়ারহার্ট এবং জনসন দুজনেই রহস্যজনক ও মর্মান্তিক পরিস্থিতিতে মারা গিয়েছিলেন বলে বিশ্বজুড়ে তুমুল জনপ্রিয়তা পান।এই তালিকায় অবলীলায় যুক্ত হতে পারে ব্রিটিশ নারী বৈমানিক শিলা স্কট-এর নাম।

শিলা স্কটও ব্যক্তিগত জীবনে চরম ট্র্যাজেডির শিকার হয়েছিলেন। তার বিমান চালনার দক্ষতা পূর্বসূরিদের চেয়ে কোনো অংশেই কম ছিল না। তিনি বিশ্বের তৃতীয় নারী হিসেবে একা বিমান চালিয়ে পুরো বিশ্ব প্রদক্ষিণ করার রেকর্ড গড়েছিলেন।

১৯৬৬ সালের গ্রীষ্মে ইংল্যান্ড যখন বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে ভাসছে, ঠিক তখনই শিলা স্কট তার ঐতিহাসিক যাত্রা সম্পন্ন করেন। ২৮ হাজার ৬৫৬ মাইল পাড়ি দিয়ে তিনি শুধু নারীদের নয়, যেকোনো পাইলটের করা দীর্ঘতম একক বিমান যাত্রার রেকর্ড ভেঙে দেন। ১৯৬৬ সালের ১৮ মে তিনি হিথ্রো থেকে উড্ডয়ন করেছিলেন। তার বিমানের নাম ছিল ‍‍`মিথ টু‍‍`, যা একটি পাইপার কোমাঞ্চে মডেলের বিমান। এই রোমাঞ্চকর যাত্রায় তিনি ১৯টি দেশ পাড়ি দিয়েছিলেন এবং ৩৪ দিনে মোট ১৮৯ ঘণ্টা আকাশে উড়েছিলেন।

রোম, এথেন্স হয়ে দামেস্কে প্রথম যাত্রাবিরতি নেন তিনি। এরপর ভারতের জয়পুর, দিল্লি এবং কলকাতায় তিনবার থামেন স্কট।

সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়া হয়ে তিনি পৌঁছান অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেন ও সিডনিতে। সেখান থেকে অকল্যান্ড, ফিজি এবং হাওয়াই হয়ে প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দেন তিনি। সান ফ্রান্সিসকো, ফিনিক্স, এল পাসো, ওকলাহোমা সিটি এবং নিউইয়র্ক হয়ে আমেরিকার মূল ভূখণ্ড স্পর্শ করেন। আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে আজোরেস ও লিসবন হয়ে দেশে ফেরেন তিনি। ২০ জুন হিথ্রোতে নামার পর তাকে নিয়ে সারা বিশ্বের গণমাধ্যমে ব্যাপক হইচই শুরু হয়।

ওই বছরই তাকে সম্মানজনক হারমন ট্রফি দেওয়া হয়। চার্লস লিন্ডবার্গ এবং হাওয়ার্ড হিউজেসের মতো কিংবদন্তিরা এর আগে এই পুরস্কার পেয়েছিলেন। ১৯২২ সালের ২৭ এপ্রিল ওরচেস্টারে জন্ম নেওয়া স্কটের শৈশব ছিল বেশ সচ্ছল কিন্তু চরম অশান্তিপূর্ণ। অ্যালিস অটলি স্কুল থেকে তাকে কয়েকবার বহিষ্কার করার উপক্রম হয়েছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি নৌবাহিনীর নার্স হিসেবে কাজ করেন এবং পরে কিছুদিন অভিনয়ও করেন। ১৯৪৫ সালে রুপার্ট বেলামির সঙ্গে তার বিয়ে হয়, যা ১৯৫০ সালেই ভেঙে যায়। জীবনের কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য না পেয়ে তিনি ১৯৫৮ সালে হ্যাম্পশায়ারের থ্রুক্সটন অ্যারোড্রোমে বিমান চালনার প্রশিক্ষণ শুরু করেন। মাত্র নয় মাস প্রশিক্ষণের পরই ৩৬ বছর বয়সে তিনি প্রথমবারের মতো একা বিমান চালান।

এরপর তিনি থ্রুক্সটন জ্যাকারু নামের একটি বিমান কেনেন এবং পাঁচ বছর ধরে সেটি ওড়ান।

পরবর্তী ছয় বছরে স্কট একশরও বেশি বিমান চালনার গতির রেকর্ড গড়েন। ১৯৬৯ সালে তিনি লন্ডন থেকে সিডনি এয়ার রেসে একমাত্র একক নারী পাইলট হিসেবে অংশ নেন। ১৯৭১ সালে তিনি ‍‍`মিথ্রি‍‍` নামের একটি পাইপার অ্যাপাচি বিমানে করে উত্তর মেরুর ওপর দিয়ে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বভ্রমণ করেন। হালকা বিমানে উত্তর মেরু পাড়ি দেওয়ার ঘটনা সেটিই ছিল প্রথম।

আকাশে অসাধারণ দক্ষতা দেখালেও মাটিতে তার জীবন মোটেও সুখকর ছিল না। টানা ১২ বছর ধরে চারবার পরীক্ষা দিয়ে অবশেষে ১৯৭১ সালে তিনি ড্রাইভিং লাইসেন্স পান। সত্তর দশকে অবসর নেওয়ার পর তিনি চরম আর্থিক সংকটে পড়েন। তার দাবি অনুযায়ী, তৃতীয় বিশ্বভ্রমণের খরচ জোগাতে গিয়ে তিনি ৮২ হাজার পাউন্ড ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েন।

জীবনের শেষ দিনগুলো তিনি চরম দারিদ্র্যের মধ্যে পিমলিকোর একটি বেসমেন্ট ফ্ল্যাটে কাটান।

ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে ১৯৮৮ সালের ২০ অক্টোবর ৬৬ বছর বয়সে তিনি মারা যান। অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্টের মতো তার মৃত্যু সংবাদ পত্রিকার প্রথম পাতায় জায়গা পায়নি। তার জীবনীকার জুডি লোম্যাক্স তাকে জনসনের চেয়েও দক্ষ পাইলট হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। লোম্যাক্সের মতে, জনসন ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে অস্ট্রেলিয়া গিয়েছিলেন, কিন্তু শিলা স্কট ঠিক জানতেন তিনি কী করছেন।

banner
Link copied!