বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা: কেন বাড়ছে ভেজাল আতঙ্ক?

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ২১, ২০২৬, ০১:১২ পিএম

ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা: কেন বাড়ছে ভেজাল আতঙ্ক?

দিল্লির বাসিন্দা ৫৫ বছর বয়সী নির্মল রাও এখন আর বাজার থেকে মশলা কেনেন না। প্রতিদিন বিকেলে রোদে শুকানো হলুদ ঘরে বসেই মিক্সারে গুঁড়ো করেন তিনি। বাজারের প্যাকেটজাত খাবারের ওপর থেকে তাঁর মতো অনেক ভারতীয়রই আস্থা উঠে গেছে পুরোপুরি।এ চিত্র শুধু নির্মল রাওয়ের নয়।

ভারতের বিভিন্ন শহরের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এখন নিজেদের রান্নাঘরকে মিনি ফুড-প্রসেসিং ইউনিটে পরিণত করেছে। তারা ঘরে পনির তৈরি করছে, সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে শস্য কিনছে। নস্টালজিয়া নয়, বরং চরম অবিশ্বাসের কারণেই এই পরিবর্তন। সরকারি তথ্য বলছে, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে কর্তৃপক্ষের পরীক্ষা করা প্রতি ছয়টি খাবারের নমুনার একটি মানোত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ হয়েছে।একই সময়ে এক হাজার ১০০টির বেশি খাদ্য ব্যবসার লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে।

হায়দ্রাবাদে গত মাসে তিন হাজার কেজির বেশি ভেজাল চা পাতা জব্দ করেন খাদ্য নিরাপত্তা কর্মকর্তারা। এর মধ্যে কৃত্রিম রং, গুড়ের রস এবং মেয়াদোত্তীর্ণ চা মেশানো ছিল। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের বরাত দিয়ে জানা গেছে, শুধু রং বা লেবেলের ভুল নয়, খাবারে ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতিও বাড়ছে।খাদ্যে ভেজাল ভারতের জন্য নতুন কোনো সমস্যা নয়।

কয়েক দশক আগেও খাবারে ভেজাল বলতে দুধে পানি মেশানো বা চালে কাঁকর থাকাকে বোঝাত। কিন্তু এখন অভিযানে ডিটারজেন্ট মেশানো দুধ বা কৃত্রিম রং মেশানো মশলার সন্ধান মেলে। ২০০৬ সালের আইনের অধীনে ভারতের ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ড অথরিটি (এফএসএসএআই) গঠিত হয়, যারা খাদ্য উৎপাদন ও সংরক্ষণের নিয়ম তদারকি করে।

সংস্থাটির সাবেক প্রধান পবন আগরওয়াল মনে করেন, এটি বিশ্বের অন্যতম আধুনিক খাদ্য নিরাপত্তা আইন।

ছোট খাবারের দোকান থেকে শুরু করে বড় কোম্পানি—সবাইকেই এই আইনের অধীনে লাইসেন্স নিতে হয়। কিন্তু বাস্তবে, কোনো বড় অঘটন ঘটার পরই কেবল তৎপরতা চোখে পড়ে। আগরওয়ালের মতে, বড় কোম্পানিগুলো বাজারে পণ্য ছাড়ার আগে পরীক্ষা করবে বলে আশা করা হয়, কিন্তু ভারতের বিশাল অনানুষ্ঠানিক খাদ্য অর্থনীতি সেভাবে কাজ করে না।

খাদ্য পরীক্ষাগার অরিগা রিসার্চের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৌরভ আরোরা জানিয়েছেন, ব্যবসায়ীদের বছরে মাত্র এক বা দুবার নমুনা পাঠাতে হয়।

আর এই সীমিত সুযোগটাই কাজে লাগায় অনেক অসাধু ব্যবসায়ী। তারা নিশ্চিত করে, ল্যাবে পাঠানো নমুনাটি যেন ঠিক থাকে, বাকি পণ্যগুলো মানহীন হলেও। তাছাড়া, তেল, আটা বা মশলার মতো খোলা পণ্যগুলো নামমাত্র মোড়কে বিক্রি হওয়ায় এর উৎস বের করা কঠিন।আইন প্রয়োগের দুর্বলতা আরেকটি বড় বাধা।

মহারাষ্ট্রের মতো বিশাল রাজ্যে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত লাখ লাখ খাবারের দোকান রয়েছে। অথচ সেখানে খাদ্য নিরাপত্তা কর্মকর্তার সংখ্যা ৫০০ জনেরও কম। খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ সঞ্জয় ইন্দানি প্রশ্ন তুলেছেন, এত কম লোকবল নিয়ে কীভাবে সবাইকে জবাবদিহির আওতায় আনা সম্ভব?

ইতালি বা যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোতে কোনো পণ্যে ত্রুটি পেলে তা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বাজার থেকে সরিয়ে নেওয়া যায়।

কিন্তু ভারতে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে কয়েক সপ্তাহ লেগে যায়। সম্প্রতি ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, দূষিত পণ্য চিহ্নিত করে বাজার থেকে সরানোর আগেই তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।ভোক্তারা এখন বাধ্য হয়ে বেশি দামে নিরাপদ খাবার খুঁজছেন।

মুম্বাইয়ের বাসিন্দা ২৯ বছর বয়সী তিয়াশ দে জানান, বাড়তি খরচ হলেও তিনি এখন নামিদামি ব্র্যান্ডের খাবার কেনেন। বাজারদরের চেয়ে ৫০ শতাংশ বেশি দাম দিয়ে খামার থেকে সরাসরি দুধ আনান তিনি। ভারতের বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (সিএসআইআর) প্রধান বিজ্ঞানী ড. মীনাক্ষী সিংয়ের মতে, আগামী ২০৩৩ সালের মধ্যে ভারতের অর্গানিক খাবারের বাজার এক হাজার ৮১ কোটি ডলারে পৌঁছাবে।তবে চিকিৎসকরা দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে সবচেয়ে বেশি চিন্তিত।

দিল্লির ফোর্টিস হাসপাতালের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের প্রধান রিকেশ কুমার বানসাল জানিয়েছেন, সাময়িকভাবে বদহজম বা মাথাব্যথা হলেও দীর্ঘমেয়াদে এসব খাবার লিভার ও কিডনির মারাত্মক ক্ষতি করে। হরমোনের সমস্যা ও দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকিও বাড়ায়।

এফএসএসএআই-এর সাবেক প্রধান পবন আগরওয়ালের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে এখন ভেজাল খাবারের খবর দ্রুত ছড়ায়।

এতে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। সৌরভ আরোরা মনে করেন, শুধু আইন দিয়ে এই সংকট দূর করা সম্ভব নয়, উৎপাদনকারী থেকে ভোক্তা—সবার সচেতনতা প্রয়োজন। আর সেই সচেতনতার অভাবেই নির্মল রাওয়ের মতো সাধারণ নাগরিকরা প্রশ্ন তুলছেন, মৌলিক খাবারটুকুর ওপরই যদি ভরসা না থাকে, তবে তারা কোথায় যাবেন?

banner
Link copied!