একসময় বাঙালির বিয়ের গায়ে হলুদ মানেই ছিল বাড়ির উঠোনে বাঁশের প্যান্ডেল, আলপনা, কলাপাতা আর কাঁচা হলুদের মিষ্টি ঘ্রাণ। পাত্র ও পাত্রীপক্ষের পারিবারিক আবেগ আর আচার-অনুষ্ঠানের ভিন্ন রঙের মিশ্রণে তৈরি হতো এই সামাজিক উৎসব। কিন্তু হাজার বছর ধরে চলে আসা সেই চেনা লোকজ ঐতিহ্যের চিরন্তন রূপে এখন এক বড় ধরনের রূপান্তর লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
শহরের ব্যস্ততা ও সময়ের অভাবে এখন আয়োজন বদলে গেছে।
আগে যেখানে বর ও কনের বাড়িতে আলাদাভাবে ঘরোয়া পরিবেশে মাটির সোঁদা গন্ধে উৎসব হতো, সেখানে এখন জায়গা করে নিয়েছে শহরের অভিজাত কনভেনশন হল বা ওপেন এয়ার রিসোর্ট। দুই পরিবারের সদস্যরা মিলে এখন একই মঞ্চে আয়োজন করছেন যৌথ গায়ে হলুদ। আলো ঝলমলে থিম ডেকোরেশন, ডিজে মিউজিক, ধোঁয়ার কৃত্রিম আবহ আর কোরিওগ্রাফি করা নাচের কারণে এই লোকজ অনুষ্ঠানটি এখন অনেকাংশে একটি জমকালো `প্রি-ওয়েডিং শো`-তে পরিণত হয়েছে। কেবল গাঁদা ফুল দিয়ে সাজানোর দিন পেরিয়ে আধুনিক ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের ছোঁয়ায় মেজেন্টা, সবুজ বা নীল রঙের কৃত্রিম থিম ডেকোরেশন এখন মূল আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।
অনুষ্ঠানের খাবারের মেন্যুতেও এই আধুনিকতার ছোঁয়া বেশ স্পষ্ট। অতীতে গায়ে হলুদে নানা পদের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি কিংবা সুনিপুণ নকশার দেশীয় পিঠার চল ছিল সবচেয়ে বেশি, যেখানে অতিথিদের মিষ্টিমুখ করানোই প্রধান রীতি হিসেবে ধরা হতো। এখন সেই চিরাচরিত রীতির জায়গায় যুক্ত হয়েছে ফুচকা, চটপটি, কাবাব কিংবা লাইভ স্টেশনের বাহারি পশ্চিমা খাবার। পানীয় হিসেবে দেদারসে সরবরাহ করা হচ্ছে কোল্ড কফি এবং ফিউশন ডেজার্ট। এই চাকচিক্য ও নিখুঁত প্রদর্শনের চাপে অনেক সময় উৎসবের চিরায়ত স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দটাই হারিয়ে যাচ্ছে।
সবকিছুতেই এখন একটি নিখুঁত ফটোজেনিক মুহূর্ত তৈরির প্রতিযোগিতা চলছে।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে গায়ে হলুদের মূল উপাদান অর্থাৎ হলুদ মাখানোর চিরাচরিত নিয়মে। ভারী মেকআপ নষ্ট হওয়ার ভয় কিংবা অত্যন্ত দামি পোশাকে দাগ লাগার আশঙ্কায় কনে থেকে শুরু করে আমন্ত্রিত অতিথিরাও এখন বেশ সতর্ক থাকেন। ক্যামেরার সামনে সুন্দর ও নিখুঁত ছবি তোলার জন্য গালে আলতো করে একটু হলুদ ছুঁইয়ে দেওয়ার মধ্যেই এখন এই আদি নিয়মটি সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। আপনজনদের সাথে হলুদ মাখামাখি নিয়ে পূর্বে যে একটা বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস ছিল, আধুনিকতার চাপে তা এখন যান্ত্রিক রূপ নিয়েছে।
জসীমউদ্দীনের কবিতা কিংবা পুরনো বাংলা সাহিত্যে বিয়ের যে লোকজ গীতের কথা আমরা সচরাচর পড়ি, বর্তমানের সাউন্ড সিস্টেমের ভিড়ে তা পুরোপুরি হারিয়ে গেছে। মুখে মুখে বিয়ের গান গাওয়ার চল এখন আর নেই, বরং পেশাদার কোরিওগ্রাফার রেখে সপ্তাহজুড়ে নাচের মহড়া দিয়ে বর ও কনে পক্ষের নাচের লড়াইটাই এখন অনুষ্ঠানের প্রধান বিনোদন। সময়ের সাথে উৎসবের রূপ বদলানো স্বাভাবিক হলেও আধুনিকতার জোয়ারে নিজেদের সংস্কৃতির শেকড় বা মাটির গন্ধটুকু হারিয়ে গেলে উৎসবের আসল প্রাণটাই ফিকে হয়ে যায়।
