বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

কেল্প চাষে মার্কিন নারীর অভাবনীয় সাফল্য, ঝুঁকছেন শেফরা

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ১৯, ২০২৬, ০৩:৩২ পিএম

কেল্প চাষে মার্কিন নারীর অভাবনীয় সাফল্য, ঝুঁকছেন শেফরা

নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনের বিলাসবহুল করপোরেট জীবনের ইঁদুরদৌড় ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাট উপকূলে সমুদ্রের নিচে এক অনন্য পরিবেশবান্ধব ও সুস্বাদু সামুদ্রিক শৈবাল বা ‍‍`সুগার কেল্প‍‍` চাষের বিপ্লব শুরু করেছেন সুজি ফ্লোরেস নামের এক মার্কিন নারী। এক দশক আগে ম্যানহাটনের একটি নামী একাডেমিক প্রকাশনা সংস্থায় ডেস্ক জব করা সুজি আজ কানেকটিকাটের স্টোনিংটন মেরিনায় বসবাস করছেন এবং সেখান থেকেই পরিচালনা করছেন তার নিজস্ব ‍‍`স্টোনিংটন কেল্প কোম্পানি‍‍`। আমেরিকানদের খাদ্য তালিকায় এই পুষ্টিকর সামুদ্রিক শৈবালকে জনপ্রিয় করে তুলতে তিনি গত কয়েক বছর ধরে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন।

এই কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়েই তিনি প্রমাণ করেছেন যে ভবিষ্যৎ টেকসই খাদ্যের উৎস লুকিয়ে আছে সমুদ্রের ঢেউয়ের নিচেই।

সুজির এই রূপান্তরের পেছনে ছিল তার পারিবারিক জীবনের এক গভীর উপলব্ধি। ইরাক ও আফগানিস্তানে যুদ্ধকালীন আলোকচিত্রী হিসেবে কাজ করা তার স্বামী জে যখন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে ঘরে ফেরেন এবং তাদের পরপর তিনটি সন্তান হয়, তখন সুজি নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেন। করপোরেট সফটওয়্যারের বাজার গবেষণা করার চেয়ে নিজের জীবনের একটি অর্থপূর্ণ উদ্দেশ্য খোঁজার তাগিদে তারা উত্তর দিকে চলে আসেন এবং রোড আইল্যান্ড সীমান্তের একটি জরাজীর্ণ মেরিনা কিনে নেন। এরপর সুজি পরিবেশ বিজ্ঞানের ওপর পড়াশোনা শুরু করেন এবং কানেকটিকাট বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী চার্লি ইয়ারিশ ও গ্রিনওয়েভ নামক একটি অলাভজনক সংস্থার সহায়তায় কেল্প চাষের লাইসেন্স ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জন করেন।

তবে চাষ শুরু করার পর সুজি দেখতে পান যে মার্কিন বাজারে এই শৈবালের কোনো তৈরি চাহিদা বা মার্কেট ছিল না, কারণ আমেরিকার মানুষ সামুদ্রিক শৈবাল খেতে অভ্যস্ত ছিল না। বাধ্য হয়ে তিনি নিজেই বাজারের চাহিদা তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেন এবং বিভিন্ন নামী রেস্তোরাঁ ও শেফদের কাছে গিয়ে কেল্পের মৃদু ও নোনতা স্বাদের কার্যকারিতা ব্যাখ্যা করতে শুরু করেন। মানুষ সাধারণত মনে করে সামুদ্রিক শৈবাল রাবারের মতো শক্ত হয়, কিন্তু পূর্ব উপকূলের এই সুগার কেল্প অত্যন্ত নরম ও হালকা। সুজির এই বিপণন কৌশল দারুণভাবে সফল হয় এবং বর্তমানে প্রতি মৌসুমে তার খামারের উৎপাদিত সমস্ত কেল্প আগাম বিক্রি হয়ে যায়।

কানেকটিকাটের মিস্টিক অঞ্চলের বিখ্যাত রেস্তোরাঁ ‍‍`দ্য শিপরাইটস ডটার‍‍`-এর প্রধান শেফ ডেভিড স্ট্যানব্রিজ—যিনি ২০২৬ সালের জেমস বেয়ার্ড ফাইনালিস্ট হিসেবে মনোনীত হয়েছেন—সুজির খামারের কেল্পের অন্যতম প্রধান ক্রেতা। তিনি জানান, নিউ ইংল্যান্ডের তীব্র শীতে মাটিতে যখন কোনো সবুজ সবজি জন্মায় না, তখন সমুদ্রের নিচে এই কেল্পই প্রথম তাজা সবজি হিসেবে তাদের প্লেটে আসে। এই সুগার কেল্প অত্যন্ত মচমচে, হালকা এবং নোনতা স্বাদের হওয়ায় যেকোনো খাবারের সাথে সহজেই মানিয়ে যায়। সবচেয়ে বড় কথা, এই কেল্পটি যে পানির মধ্যে বড় হয়েছে, তার একটি নিজস্ব সামুদ্রিক স্বাদ বহন করে, যা খাবারের স্বাদকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রয়োজনীয় সামুদ্রিক শৈবালের ৯০ শতাংশের বেশি এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করে, ফলে স্থানীয়ভাবে এর প্রক্রিয়াকরণ ও বন্টন পরিকাঠামো এখনো বেশ দুর্বল। তাছাড়া সমুদ্রের বুকে তীব্র শীতকালীন ঝড় ও প্রতিকূল স্রোতের কারণে খামারের ফসল নষ্ট হওয়ার বড় ঝুঁকি থাকে, যা চলতি শীতে সুজির প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ ফসল ধ্বংস করে দিয়েছে। তা সত্ত্বেও সুজি আশাবাদী, কারণ এই সুগার কেল্প বড় হওয়ার সময় সমুদ্রের ক্ষতিকারক নাইট্রোজেন দূষণ শোষণ করে পানির গুণগত মান বাড়ায় এবং মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক জীবের চমৎকার বাসস্থান তৈরি করে। উপকূলের ঐতিহ্যবাহী লবস্টার বা গলদা চিংড়ি শিল্প যখন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ধ্বংসের মুখে, তখন সুজি বিশ্বাস করেন এই কেল্প চাষই উপকূলীয় মৎস্যজীবীদের ভবিষ্যৎ টেকসই আয়ের প্রধান উৎস হয়ে উঠবে।

banner
Link copied!