দক্ষিণ কোরিয়ার রন্ধনশিল্প তার অনন্য স্বাদ, ঝাল, মিষ্টি ও গাঁজন প্রক্রিয়ায় তৈরি বিভিন্ন পদের কারণে বিশ্বজুড়ে দারুণ জনপ্রিয়। দেশটির বিখ্যাত কোরিয়ান বারবিকিউ বা স্ট্রিট ফুডের দোকানে গেলে দেখা যায়, প্রতিটি খাবারের সাথে অন্য একটি নির্দিষ্ট সাইড ডিশ বা পানীয় পরিবেশন করার এক অলিখিত নিয়ম রয়েছে। যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই স্বাদ ও উপাদানের সংমিশ্রণগুলোকে কোরিয়ানরা অত্যন্ত পবিত্র এবং অলঙ্ঘনীয় বলে মনে করেন, যা তাদের সংস্কৃতির একটি প্রধান অংশ।
বিশেষ করে সিউলের রাস্তার ধারের খাবারের দোকান কিংবা ঐতিহ্যবাহী বাজারে এই জুটির আর্ট বা শিল্প স্পষ্ট লক্ষ্য করা যায়।
এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় একটি স্ট্রিট ফুড কম্বো বা জুটি হলো টপবোকি এবং সুন্দাই। চালের গুঁড়ো দিয়ে তৈরি নলাকার নরম কেক যখন ঝাল-মিষ্টি গচুজ্যাং সসে রান্না করা হয়, তখন তাকে টপবোকি বলা হয়। কোরিয়ানরা এই ঝাল টপবোকির সসের মধ্যে ডুবিয়ে খাওয়ার জন্য সুন্দাই বা এক ধরণের রক্ত সসেজ পছন্দ করেন, যা কাঁচের নুডলস ও মাংস দিয়ে ঠাসা থাকে। এর পাশাপাশি সামুদ্রিক শৈবালে মোড়ানো ভাত ও সবজির রোল কিমবাপ কিংবা ভাজা ডাম্পলিংও এই লাল সসে ডুবিয়ে খাওয়া হয়, যা খাবারের স্বাদকে এক অন্য মাত্রায় নিয়ে যায়।
আরেকটি বিশ্বখ্যাত জুটি হলো `চিম্যাক`, যা মূলত কোরিয়ান ফ্রাইড চিকেন বা ভাজা মুরগি এবং বিয়ারের সমন্বয়ে গঠিত। ২০০২ সালের দক্ষিণ কোরিয়া-জাপান ফিফা বিশ্বকাপের সময় এই জুটিটি দেশজুড়ে এক বিশাল সামাজিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়, যা আজ বেসবল ম্যাচ কিংবা যেকোনো আড্ডার ডিফল্ট অপশন। ভাজা মুরগির অতিরিক্ত তেলতেলে ভাব কাটানোর জন্য কোরিয়ানরা সর্বদা এর সাথে টক-মিষ্টি মুলো বা আচারযুক্ত `মু` খেয়ে থাকেন। সাধারণ ফ্রাইড চিকেনের পাশাপাশি অর্ধেক মসলা ছাড়া এবং অর্ধেক সস মাখানো `বানবান` চিকেনও এই ক্ষেত্রে অত্যন্ত জনপ্রিয়।

কোরিয়ানদের মধ্যে বৃষ্টি নামলেই আরেকটি বিশেষ জুটি খাওয়ার ধুম পড়ে যায়, আর সেটি হলো পাজিওন এবং মাকগলি। পাজিওন হলো এক ধরণের মুখরোচক প্যানকেক এবং মাকগলি হলো চাল থেকে তৈরি ঐতিহ্যবাহী হালকা ক্রিমযুক্ত অ্যালকোহলযুক্ত পানীয়। কোরিয়ানরা বৃষ্টির দিনে প্যানকেক খেতে পছন্দ করেন কারণ তেলের মধ্যে এটি ভাজার সময় যে মৃদু শব্দ তৈরি হয়, তা হুবহু বৃষ্টির শব্দের মতো শোনায়। এছাড়া গরমের দিনে তারা ম্যারিনেট করা গালবি বা ছোট পাঁজরের মাংসের সাথে বরফ শীতল সুপযুক্ত নুডলস `নেংমিয়ন` খেতে পছন্দ করেন, যা শরীরের ক্লান্তি দূর করে প্রশান্তি আনে।
সবশেষে কোরিয়ান ড্রামা বা নাটকে প্রায়শই যে জুটিটি দেখা যায়, তা হলো ইনস্ট্যান্ট রানিয়ন এবং কিমবাপ। সিউলের হান গ্যাং পার্কের পাশে কিংবা বিভিন্ন কনভেনিয়েন্স স্টোরের বাইরে শিক্ষার্থী ও কর্মজীবীদের এই কম্বোটি খেতে দেখা যায়, যা অত্যন্ত সস্তা ও দ্রুত পেট ভরানোর জন্য উপযোগী। রানিয়নের তীব্র ঝাল ঝোল কিমবাপের সতেজ কামড়ের সাথে চমৎকার ভারসাম্য তৈরি করে। এছাড়া কোরিয়ান-চায়নিজ নুডলসের সাথে সবসময় `তাংসুয়ুক` বা মিষ্টি-টক সসে ভাজা মাংসের পদটি খাওয়া কোরিয়ার আরেকটি পবিত্র নিয়ম, যা ভাঙার কথা কোনো স্থানীয় নাগরিক ভাবতেও পারেন না।
