বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

যুক্তরাজ্যে ব্লু ব্যাজ জালিয়াতি: কাঠগড়ায় মানসিক স্বাস্থ্য নীতি

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ১৯, ২০২৬, ০৫:০২ পিএম

যুক্তরাজ্যে ব্লু ব্যাজ জালিয়াতি: কাঠগড়ায় মানসিক স্বাস্থ্য নীতি

যুক্তরাজ্যে শারীরিক প্রতিবন্ধী ও গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য নির্ধারিত বিশেষ গাড়ি পার্কিং পারমিট বা ‍‍`ব্লু ব্যাজ‍‍` পাওয়ার ক্ষেত্রে অসাধু সুযোগ সন্ধানীদের অনৈতিক জালিয়াতি ও অপব্যবহারের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের স্থানীয় কাউন্সিলগুলো চিকিৎসকের সুনির্দিষ্ট সনদ ছাড়াই কেবল ‍‍`অদৃশ্য প্রতিবন্ধকতা‍‍` বা মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার স্ব-শনাক্তকরণকে স্বীকৃতি দেওয়ায় এই সংকট তৈরি হয়েছে। এর ফলে যারা সত্যিকার অর্থেই হাঁটাচলা করতে পারেন না, তারা তীব্র পার্কিং সংকটে পড়ছেন এবং পুরো স্কিমটির কার্যকারিতা এখন বড় ধরণের প্রশ্নের মুখে।

সাম্প্রতিক প্রশাসনিক তথ্যে দেখা গেছে, গত তিন বছরে যুক্তরাজ্যে অদৃশ্য প্রতিবন্ধকতার অজুহাতে ব্লু ব্যাজ অনুমোদনের হার প্রায় তিনগুণ বেড়েছে।

মূলত ২০১৯ সালে এই স্কিমটি পরিমার্জন করে ডিমেনশিয়া, পারকিনসন্স বা গুরুতর বাতের মতো অদৃশ্য শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদেরও এর আওতাভুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে অনেক আবেদনকারী কোনো অফিশিয়াল ক্লিনিকাল ডায়াগনোসিস বা চিকিৎসকের আনুষ্ঠানিক সনদ ছাড়াই কেবল তীব্র উদ্বেগ বা এডিএইচডি (অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপারঅ্যাক্টিভিটি ডিসঅর্ডার)-এর মতো মানসিক অবস্থার কথা উল্লেখ করে এই বিশেষ কার্ডটি সংগ্রহ করছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্রিটেনে মানসিক স্বাস্থ্যের হঠাৎ কোনো অলৌকিক পতন ঘটেনি, বরং মানুষ ফ্রি পার্কিংয়ের এই আইনি ফাঁকটি ধরতে পেরে ব্যবস্থার চরম অপব্যবহার করছে।

এই নীতিগত শিথিলতার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন খোদ চিকিৎসকেরাই। ক্লিনিকাল সাইকোলজিস্ট ড. বেকি স্পেলম্যান—যিনি নিজে একজন এডিএইচডি আক্রান্ত ব্যক্তি—জানিয়েছেন যে তিনি নিজে কখনো এই পার্কিং সুবিধার জন্য আবেদন করবেন না। কারণ তার মতে, যাদের সত্যিকার অর্থেই গুরুতর শারীরিক সীমাবদ্ধতা বা জীবনযাত্রাকে পঙ্গু করে দেওয়া গতিশীলতার সমস্যা রয়েছে, তাদের জন্য তৈরি একটি ব্যবস্থার অপব্যবহার করা আক্ষরিক অর্থেই অনৈতিক। চিকিৎসকদের একটি বড় অংশ প্রশ্ন তুলেছেন যে, যারা ৫০ মিটার হাঁটার মতো মানসিক বা শারীরিক সক্ষমতা রাখেন না বলে দাবি করছেন, তাদের আদৌ রাস্তায় গাড়ি ড্রাইভ করার অনুমতি দেওয়া নিরাপদ কি না।

যুক্তরাজ্যের কাউন্সিলগুলোর এই দ্বিমুখী নীতির কারণে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। যদি কোনো ব্যক্তি ডান পা ভাঙা অবস্থায় কাউন্সিলের অফিসে যান, তবে কর্মকর্তারা তার কাছে চিকিৎসকের সিলমোহরযুক্ত চিঠি দাবি করবেন, কিন্তু মানসিক বা স্নায়বিক সমস্যার কথা বললে তারা কোনো প্রমাণ ছাড়াই তা মেনে নিচ্ছেন। গত সপ্তাহে একই ধরণের আরেকটি কল্যাণমূলক উদ্যোগ ‍‍`সানফ্লাওয়ার ল্যানিয়ার্ড স্কিম‍‍` তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। বিমানবন্দর ও ভিআইপি লাউঞ্জে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার জন্য তৈরি এই কার্ডটি কোনো প্রমাণ ছাড়াই যে কেউ অনলাইন থেকে সংগ্রহ করতে পারায়, অনেক সুস্থ মানুষ এর অপব্যবহার করে লাইনের সবার আগে চলে যাচ্ছেন।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে যুক্তরাজ্যের প্রায় পাঁচ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ বিশ্বাস করেন যে তারা এডিএইচডি-তে ভুগছেন, যদিও চিকিৎসকদের দ্বারা নিবন্ধিত প্রকৃত হার মাত্র ১ দশমিক ৮ শতাংশ। অনেক সমালোচক এই প্রবণতাকে নবম শ্রেণীর শারীরিক শিক্ষার ক্লাসের সাথে তুলনা করেছেন, যেখানে শিক্ষকেরা সামাজিক বা জৈবিক স্পর্শকাতরতার ভয়ে ফাঁকিবাজদের কোনো প্রশ্ন করতে সাহস পান না। এই নীতিগত পক্ষাঘাতকে কাজে লাগিয়ে এক শ্রেণীর মানুষ সম্পূর্ণ নির্লজ্জভাবে প্রতিবন্ধীদের জন্য বরাদ্দকৃত রাষ্ট্রীয় সুবিধাগুলো নিজেদের পকেটে পুরছে। ফলে এখনই যদি কঠোর নিয়মের মাধ্যমে চিকিৎসকের ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক করা না হয়, তবে এই কল্যাণমূলক ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে

banner
Link copied!