প্রতিকূল মরুভূমির তপ্ত বালুচরে মাইলের পর মাইল অনায়াসে পাড়ি দিতে সক্ষম একমাত্র প্রাণী উটকে দীর্ঘ যাত্রার ঠিক আগে মরুবাসীরা জোর করে প্রচুর পরিমাণে লবণ খাইয়ে থাকেন। আপাতদৃষ্টিতে অতিরিক্ত লবণ খাওনোর এই ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিটিকে অবৈজ্ঞানিক এবং পানিশূন্যতা বা ডিহাইড্রেশনের কারণ মনে হলেও, উটের শরীরের অভ্যন্তরীণ জীববিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং জাদুকরী ভূমিকা পালন করে। আধুনিক প্রাণিবিজ্ঞানীদের মতে, এই লবণের ব্যবহার মূলত মরুভূমির তীব্র গরমে উটের শরীরের খনিজ ও তরল পদার্থের ভারসাম্য রক্ষা করতে সাহায্য করে।
লবণ খাওয়ানোর ফলে উটের শরীরে এক অবিশ্বাস্য মেটাবলিক পরিবর্তন ঘটে যা তাকে দীর্ঘকাল পানি ছাড়া বাঁচিয়ে রাখে।
লবণ খাওয়ার পর উটের তৃষ্ণা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়, যার ফলে সে মরুভূমিতে প্রবেশের আগেই একবারে বিপুল পরিমাণ পানি পান করে নিজের শরীরে মজুত করে নেয়। এই অতিরিক্ত লবণ দীর্ঘক্ষণ হাঁটার সময় উটের রক্তে ইলেকট্রোলাইট বা খনিজের ভারসাম্য বজায় রাখে এবং শরীর থেকে পানির অপচয় রোধ করে। এছাড়া উটের পিঠের কুঁজে পানি জমা থাকে বলে যে প্রচলিত ধারণা রয়েছে, চিকিৎসাবিজ্ঞান তাকে সম্পূর্ণ ভুল বা একটি মিথ হিসেবে প্রমাণ করেছে; মূলত সেখানে চর্বি বা ফ্যাট জমা থাকে যা খাবার না পেলে গলে পানি ও শক্তিতে রূপান্তরিত হয়।
উটের টিকে থাকার পেছনে আরও কিছু প্রাকৃতিক মেকানিজম রয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো তাদের বিশেষ ডিম্বাকৃতির লোহিত রক্তকণিকা। মানুষের রক্তকণিকা গোল হলেও উটের এই ডিম্বাকৃতির গঠনের কারণে তীব্র পানিশূন্যতায় রক্ত ঘন হয়ে গেলেও রক্তনালীতে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক থাকে। এছাড়া উটের শক্তিশালী কিডনি মূত্রের মাধ্যমে পানির অপচয় প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনে এবং তাদের নাসারন্ধ্র নিঃশ্বাস ছাড়ার সময়ও শরীরের অভ্যন্তরীণ জলীয় বাষ্পকে বাতাসে উড়ে যেতে দেয় না। মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার যাযাবর মানুষ শত শত বছর ধরে কোনো আধুনিক ল্যাবরেটরি ছাড়াই কেবল নিবিড় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে উটের এই জৈবিক রহস্য উন্মোচন করেছিলেন।
