হজের মৌসুমে আরাফাতের ময়দান কিংবা কাবা চত্বর—যেদিকেই তাকানো যায়, মানুষের ঢল। এই ঢলের মাঝে একটি ধ্বনি সবার ওপরে। সেটি হলো তালবিয়া। ইহরাম বাঁধার পর থেকে পুরুষ হাজিরা উচ্চৈঃস্বরে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে এই ধ্বনি উচ্চারণ করেন। এর প্রতিটি শব্দমালার মধ্যে রয়েছে এক সম্মোহনী শক্তি, যা মানুষের আত্মাকে জাগিয়ে তোলে এবং সৃষ্টিকর্তার সামনে নিজেকে বিলীন করে দেওয়ার সাহস জোগায়।
এটি কেবল শব্দ নয়, এটি দাসত্বের অঙ্গীকার।
তালবিয়া কোনো সাধারণ স্লোগান নয়, এটি মহান আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও আধিপত্যের মহাসমুদ্রে বিলীন হওয়ার এক মাধ্যম। ধনী-গরিব, রাজা-প্রজা, শিক্ষিত-অশিক্ষিত কিংবা সাদা-কালো—সব বৈষম্য ঘুচিয়ে এই ধ্বনি মানুষকে এক কাতারে নিয়ে আসে। যখন কোনো মুসলিম তালবিয়া পাঠ করেন, তখন তার চারপাশের মাটি, বৃক্ষরাজি ও পাথরখণ্ডও তার সঙ্গে এই আহ্বানে শামিল হয়। এই হাদিসটি সাহল ইবনে সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, যা তালবিয়ার আধ্যাত্মিক গভীরতাকে স্পষ্ট করে তোলে।
ইবরাহিম (আ.)-এর সেই ঘোষণা ও রূহের সাড়া
হজ হলো বিশ্ব মুসলিমের মহাসম্মেলন। পবিত্র কাবাঘরের নির্মাতা ইবরাহিম (আ.)-এর সেই স্মৃতি আজো প্রতিটি হাজির হৃদয়ে স্পন্দিত হয়। যখন আল্লাহ তাআলা ইবরাহিম (আ.)-কে হজের ঘোষণা দেওয়ার নির্দেশ দেন, তখন তিনি এই জনমানবহীন প্রান্তরে দাঁড়িয়ে কার কাছে ডাক দেবেন ভেবে চিন্তিত হয়েছিলেন। জবাবে আল্লাহ বলেছিলেন, আপনার দায়িত্ব ঘোষণা করা, আর মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব আমার। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ইবরাহিম (আ.) যখন ডাক দিলেন, সেই আওয়াজ কিয়ামত পর্যন্ত আসা সব মানুষের রূহের কান পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। সেই আহ্বানের জবাবেই যারা কবুল করেছিলেন, তারাই আজ তালবিয়া পাঠ করছেন।
তালবিয়ার মূল শব্দগুলো হলো—‘লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইক লা-শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নিমাতা লাকা ওয়ালমুলক, লা শারিকা লাক।’ এর অর্থ, ‘আমি হাজির, হে আল্লাহ! আমি হাজির। আপনার কোনো শরিক নেই। নিশ্চয় সব প্রশংসা, নিয়ামত ও রাজত্ব কেবল আপনারই।’ এই ঘোষণায় কোনো অহংকার নেই, নেই কোনো সংকীর্ণতা।
শিরকমুক্ত একত্ববাদের ঘোষণা
হজের তালবিয়া আমাদের শেখায় সব ধরনের শিরক বা অংশীদারিত্ব বর্জনের শিক্ষা। জাহেলি যুগে মানুষ হজের সময় তালবিয়া পাঠ করলেও তাতে শিরকের সংমিশ্রণ ঘটিয়েছিল। তারা বলত, ‘আপনার শরিক আছে, তবে আপনি তার মালিক।’ কিন্তু ইসলাম এসেছে এই ভুল ধারণা ভাঙতে। তালবিয়ার ‘লা-শারিকা লাক’ অংশটি বারবার উচ্চারণের মাধ্যমে একজন মুমিন ঘোষণা করেন যে, আনুগত্য, ইবাদত কিংবা প্রার্থনায় আল্লাহর কোনো শরিক নেই। শিরক একটি ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ, আর তালবিয়া হলো সেই অপরাধ থেকে মুক্তির এক মহাপ্রশস্তি।
হাজিরা তাদের পরিবার-পরিজন, সম্পদ ও প্রিয় পোশাক ত্যাগ করে এই পথে চলেন। তালবিয়া পাঠের মাধ্যমে তারা প্রভুর কাছে নিজেদের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করেন। এটি কেবল জান্নাতে প্রবেশের চাবি নয়, বরং এটি আল্লাহর নিয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং ইবরাহিমি মিল্লাতের ধারাবাহিকতা রক্ষার এক অনন্য স্বীকৃতি।
