শনিবার, ০৯ মে, ২০২৬, ২৬ বৈশাখ ১৪৩৩

১৮ মাস পর শোকাতুর গাজা পরিবারের কাছে নিখোঁজ যুবকের ফোন

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ৮, ২০২৬, ০৫:২৯ পিএম

১৮ মাস পর শোকাতুর গাজা পরিবারের কাছে নিখোঁজ যুবকের ফোন

গাজার ঈদ নায়েল আবু শায়ারের পরিবার দীর্ঘ দেড় বছর ধরে বিশ্বাস করে আসছিল যে তাদের বড় ছেলে আর বেঁচে নেই। গাজার প্রতিটি মর্গে হন্যে হয়ে খোঁজা, হাসপাতালগুলোতে দিনের পর দিন অপেক্ষা আর শেষ পর্যন্ত মৃত্যু সনদ হাতে পাওয়ার পর শোকের তাঁবু গেড়েছিল পরিবারটি। তবে দীর্ঘ ১৮ মাসের সেই দুঃসহ যন্ত্রণার অবসান ঘটিয়ে একটি ফোন কল সব পাল্টে দিয়েছে। এক আইনজীবীর মাধ্যমে পরিবারটি নিশ্চিত হয়েছে যে, ঈদ নায়েল এখনো জীবিত আছেন এবং বর্তমানে তিনি ইসরায়েলের ওফার কারাগারে বন্দি। আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর ও আবেগঘন তথ্য সামনে এসেছে।

ঈদের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটি ঘটেছিল ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর। পরিবারের ভরণপোষণের জন্য কাজ খুঁজতে গিয়ে তিনি মধ্য গাজার নেৎজারিম করিডোরের কাছে নিখোঁজ হন। এই এলাকাটি বর্তমানে ‘মৃত্যু উপত্যকা’ হিসেবে পরিচিত, যেখানে ইসরায়েলি দখলদার বাহিনী গাজার উত্তর ও দক্ষিণ অংশকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। সেই সময় থেকে ঈদের আর কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছিল না। তার বাবা নায়েল আবু শায়ার আল জাজিরাকে জানান, তিনি সন্তানের লাশের জন্য হাসপাতালের মর্গগুলোর দরজায় রাত কাটিয়েছেন। আল-আকসা, আল-আওদা এবং নুসেইরাত হাসপাতালের হিমঘরগুলোতে তিনি নিজের হাতে ফ্রিজ খুলে ছেলের দেহ খুঁজেছেন, কিন্তু কিছুই পাননি।

রেড ক্রস এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার কাছে ধরণা দিয়েও কোনো লাভ হয়নি। কোনো দাপ্তরিক নথিতে ঈদের বন্দি হওয়ার তথ্য না থাকায় ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তাকে মৃত ঘোষণা করে এবং পরিবারটি তার জন্য গায়েবি জানাজা পড়ে শোক পালনের প্রস্তুতি নেয়। তবে ঈদের মা মাহা আবু শায়ার কখনো আশা ছাড়েননি। তিনি জানতেন তার ছেলে ফিরে আসবে। এক মাস আগে কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া এক ব্যক্তি জানান যে তিনি ওফার কারাগারে ঈদ নামে একজনকে দেখেছেন। গত সোমবার একজন আইনজীবী আনুষ্ঠানিকভাবে এই তথ্য নিশ্চিত করার পর পুরো পরিবারে ঈদের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে।

আল জাজিরার প্রচারিত দৃশ্যে দেখা যায়, আবু শায়ার পরিবারের সদস্যরা এবং তাদের প্রতিবেশীরা খুশিতে মিষ্টি বিতরণ করছেন। এক সময়ের শোকের তাঁবুটি এখন উৎসবের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। তবে এই ঘটনা গাজার হাজার হাজার নিখোঁজ পরিবারের জন্য এক গভীর ক্ষতকেও সামনে এনেছে। ফিলিস্তিনি সেন্টার ফর দ্য মিসিং-এর পরিচালক নাদা নাবিল জানান, গাজায় বর্তমানে সাত থেকে আট হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৫০০ জন ইসরায়েলি কারাগারে বাধ্যতামূলকভাবে নিখোঁজ বা ‘ফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স’-এর শিকার।

নাদা নাবিলের মতে, ইসরায়েল ইচ্ছাকৃতভাবে বন্দিদের তথ্য গোপন রাখে যাতে ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোকে মানসিক নির্যাতনের শিকার করা যায়। এটি একটি পরিকল্পিত সামরিক কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। রেড ক্রসকেও ইসরায়েলি কারাগারগুলোতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের চরম লঙ্ঘন। অনেক পরিবার তাদের নিখোঁজ স্বজনদের কথা প্রকাশ করতে ভয় পায়, কারণ তাদের আশঙ্কা এতে ইসরায়েলি বিমান হামলা বা বন্দির ওপর নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে।

ঈদের ফিরে আসার খবরটি যেন এক টুকরো মেঘমুক্ত আকাশ, তবে তার মায়ের চোখে এখনো উৎকণ্ঠা। তিনি আল জাজিরাকে বলেন যে এখন তার চিন্তা আরও বেড়েছে, কারণ কারাগারে তার ছেলে কী অবস্থায় আছে এবং তার ওপর কী ধরনের নির্যাতন চলছে তা তিনি জানেন না। ছেলেকে নিজের চোখে না দেখা পর্যন্ত এবং নিজের বুকে না জড়িয়ে নেওয়া পর্যন্ত এই মায়ের আনন্দ পূর্ণতা পাচ্ছে না। গাজার প্রতিটি ঘরে ঘরে এখন এমন হাজারো মায়ের প্রতীক্ষার গল্প জমা হয়ে আছে, যারা এখনো জানেন না তাদের সন্তান জীবিত নাকি মাটির নিচে কোনো গণকবরে শুয়ে আছে।

banner
Link copied!