যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানে তীব্র অর্থনৈতিক মন্দা ও আন্তর্জাতিক মানবিক সাহায্য কমে যাওয়ার কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চরম সংকটের মুখে পড়েছে। দেশটির একটি বিশাল জনগোষ্ঠী এখন তিন বেলা পেট পুরে খেতে পারছে না। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে যে, পরিবারের অন্য সদস্যদের মুখে অন্ন তুলে দিতে অনেক বাবা তাদের অতি আদরের কন্যাসন্তানকে বিক্রি করে দেওয়ার মতো চরম ও হৃদয়বিদারক সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
জাতিসংঘের সাম্প্রতিক তথ্যমতে, আফগানিস্তানের প্রতি চারজন মানুষের মধ্যে তিনজনই তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারছেন না।
বিশেষ করে ঘোর প্রদেশের মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে অনাহারের চিত্র সবচেয়ে ভয়াবহ। সেখানে শত শত কর্মহীন মানুষ প্রতিদিন ভোরে কাজের আশায় শহরের মোড়ে মোড়ে ভিড় করেন, কিন্তু দিনশেষে শূন্য হাতে বাড়ি ফিরতে হয়। স্থানীয় বাসিন্দা জুমা খান জানান, গত দেড় মাসে তিনি মাত্র তিন দিনের কাজ পেয়েছেন, যা দিয়ে পরিবারের খাবার কেনা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তার সন্তানরা টানা কয়েক রাত না খেয়ে ঘুমাতে গেছে এবং ক্ষুধার জ্বালায় পুরো পরিবার কাঁদলেও তার কিছুই করার ছিল না।
এই চরম সংকটের মধ্যে অনেক পরিবার চিকিৎসার খরচ চালাতে বা ঋণ শোধ করতে নিজেদের ছোট শিশুদের আত্মীয়দের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছে। সাইদ আহমদ নামের এক পিতা জানান, তার পাঁচ বছর বয়সী কন্যাসন্তানের অ্যাপেনডিসাইটিস ও লিভারের জটিল অস্ত্রোপচারের খরচ জোগাতে তিনি তাকে দুই লাখ আফগানির বিনিময়ে এক আত্মীয়ের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হন। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছর শিশুটি তার বাবার কাছেই থাকবে, তবে অর্থ পরিশোধ সম্পূর্ণ হলে তাকে চিরতরে নিয়ে যাওয়া হবে। অন্য এক বাবা আব্দুল রশিদ আজিমী কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, ঋণের বোঝা ও কাজের অভাব তাকে এতটাই দিশেহারা করেছে যে অন্য সন্তানদের বাঁচাতে তিনি তার যমজ কন্যাদের বিক্রি করতে প্রস্তুত।
আফগানিস্তানের এই ভয়াবহ পরিস্থিতির পেছনে আন্তর্জাতিক মহলের সাহায্য কমিয়ে দেওয়াকে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত বছরের তুলনায় চলতি ২০২৬ সালে জাতিসংঘের প্রাপ্ত সাহয্যের পরিমাণ প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় দাতারা তাদের অনুদান প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী খরা, যা দেশটির অর্ধেকেরও বেশি প্রদেশের কৃষিখাতকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, বর্তমান সংকটে তারা না পাচ্ছেন সরকারের কোনো সহায়তা, না পাচ্ছেন কোনো আন্তর্জাতিক এনজিওর ত্রাণ।
এদিকে তালেবান সরকারের পক্ষ থেকে এই চরম দারিদ্র্য ও বেকারত্বের জন্য পূর্ববর্তী মার্কিন সমর্থিত প্রশাসনকে দায়ী করা হয়েছে। সরকারের উপ-মুখপাত্র হামদুল্লাহ ফিতরাত জানান, দীর্ঘ ২০ বছরের আগ্রাসনের ফলে দেশে একটি কৃত্রিম অর্থনীতি তৈরি হয়েছিল এবং তাদের বিদায়ের পর তারা উত্তরাধিকারসূত্রে এই দারিদ্র্য ও সংকট পেয়েছেন। তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, নারী শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ওপর তালেবানের কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণেই মূলত পশ্চিমা দাতারা আফগানিস্তান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। যদিও তালেবান প্রশাসনের দাবি, মানবিক সহায়তা রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা অনুচিত।
