ভারতের পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন সরকার গঠনের কয়েক দিনের মধ্যেই রাজ্যজুড়ে অবৈধ দখল ও অননুমোদিত স্থাপনার বিরুদ্ধে একটি অত্যন্ত কঠোর ও বড় ধরনের উচ্ছেদ অভিযান শুরু করেছে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি প্রশাসন। রাজধানী কলকাতা এবং তার পার্শ্ববর্তী বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে ভারী বুলডোজার ও আধুনিক এক্সকাভেটর নামিয়ে সরকারি জমি দখলমুক্ত করার কাজ শুরু করেছে পুরসভা। সোমবার হাওড়া পুরসভার ৪৪ নম্বর ওয়ার্ডে একটি বহুতল ভবনের বিশাল অবৈধ অংশ ভেঙে ফেলার মাধ্যমে এই অভিযানের তীব্রতা বৃদ্ধি পায়, যেখানে মাত্র দুইতলা নির্মাণের আইনি অনুমতি থাকলেও ভবনটিকে পাঁচতলা পর্যন্ত অবৈধভাবে সম্প্রসারণ করা হয়েছিল।
এই নজিরবিহীন উচ্ছেদ কার্যক্রমের ফলে রাজ্যের হকার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মাঝে এক তীব্র ক্ষোভ ও চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
প্রশাসনিক রেকর্ড অনুযায়ী, গত শনিবার গভীর রাত থেকে রোববার ভোর পর্যন্ত হাওড়া ও শিয়ালদহ রেল স্টেশন সংলগ্ন প্রধান সড়কগুলোতে একযোগে একটি মেগা উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এই বিশেষ অভিযানে শত শত অস্থায়ী দোকান ও ফুটপাতের অবৈধ হকারদের বলপূর্বক সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। রাজ্যের প্রভাবশালী মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ গণমাধ্যমে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে জানিয়েছেন যে, এটি কেবল একটি প্রাথমিক শুরু মাত্র এবং সমগ্র রাজ্যজুড়ে এই ধরণের অবৈধ নির্মাণ ও সরকারি জমি দখলের বিরুদ্ধে কঠোর বুলডোজার নীতি অব্যাহত থাকবে। তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, সরকারি ভূমি দখল কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার আপস ছাড়াই আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ফুটপাত, গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সড়ক এবং বিভিন্ন রেলস্টেশন এলাকা ঘিরে বছরের পর বছর ধরে পার্ক সার্কাস, গড়িয়াহাট, এসপ্ল্যানেড, বড়বাজার ও তপসিয়ার মতো প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতে অসংখ্য অবৈধ দোকান ও স্থায়ী-অস্থায়ী স্থাপনা গড়ে উঠেছিল। হাওড়া ও শিয়ালদহের মতো অতি ব্যস্ত রেল টার্মিনালের আশপাশে চা, খাবার, পোশাক ও নিত্যপণ্যের শত শত অবৈধ দোকানের কারণে সাধারণ যাত্রী চলাচল ও যানজট পরিস্থিতি দীর্ঘকাল ধরে এক জটিল সংকট তৈরি করছিল বলে পুরসভা দাবি করেছে। এর আগে গত ১২ মে তপসিয়া-তিলজলা এলাকায় একটি অননুমোদিত চামড়ার কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ২ জনের মৃত্যুর পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্বয়ং সেই অবৈধ ভবনটি সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
কলকাতা পুরসভার বিল্ডিং বিভাগের দাবি, কেবল তপসিয়া-তিলজলা এলাকাতেই ইতিমধ্যে এক হাজারেরও বেশি সম্পূর্ণ অবৈধ স্থাপনা ও ত্রুটিপূর্ণ কাঠামো চিহ্নিত করা হয়েছে এবং গত এক দশকে নির্মিত এই অঞ্চলের প্রায় ৭০ শতাংশ ভবনই কোনো বৈধ নকশা ছাড়াই তৈরি। তবে এই তীব্র উচ্ছেদ অভিযানের বিরুদ্ধে কলকাতা হাইকোর্টে একটি বিশেষ মামলা দায়ের করা হলে আদালত আগামী ২২ জুন পর্যন্ত ওই নির্দিষ্ট এলাকার উচ্ছেদ কার্যক্রমের ওপর একটি অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ জারি করেছে। আদালতের বাইরে ক্ষুব্ধ ও উচ্ছেদ হওয়া ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দাবি, তারা বিগত ১৫ থেকে ২০ বছর ধরে ওই স্থানে নিয়মতান্ত্রিক ব্যবসা পরিচালনা করলেও প্রশাসন কোনো আগাম নোটিশ বা সময় না দিয়েই রাতের অন্ধকারে তাদের জীবিকা ধ্বংস করে দিয়েছে।
রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস এই আকস্মিক বুলডোজার অভিযানকে চরম নির্মম, অমানবিক এবং রাজনৈতিক প্রতিশোধমূলক আখ্যা দিয়ে দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনা ও প্রতিবাদের ঝড় তুলেছে। অনেক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, উপযুক্ত বিকল্প পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে এভাবে উচ্ছেদ করা হলে আত্মহত্যা করা ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় থাকবে না। তবে নবগঠিত রাজ্য সরকার তাদের অবস্থানে অনড় থেকে সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, কলকাতাকে সম্পূর্ণ তিলোত্তমা ও অবৈধ দখলমুক্ত নগরী হিসেবে গড়ে তুলতেই এই নিয়মতান্ত্রিক আইনি সংস্কার বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
