সংযুক্ত আরব আমিরাতকে (ইউএই) ইরানের চলমান যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়ার এবং তেহরানের একটি কৌশলগত অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য অত্যন্ত জোরালো পরামর্শ দিচ্ছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। ট্রাম্পের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের একটি প্রভাবশালী অংশ আমিরাতকে সরাসরি ইরানের লাভান দ্বীপ দখল করার উসকানি দিচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে। এই নতুন প্ররোচনা মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ১১ সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মাঝে আমিরাতের সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং ইসরায়েলের সাথে তার ক্রমবর্ধমান অক্ষ গঠনকে নতুন করে উন্মোচিত করেছে।
ট্রাম্পের সাবেক এক শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা আমিরাতকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর পরিবর্তে সেখানে নিজস্ব স্থলসেনা মোতায়েনের পরামর্শ দিয়েছেন।
গত ফেব্রুয়ারির শেষভাগ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে বিমান হামলা শুরু করার পর থেকেই তেহরানের মূল পাল্টা আঘাতের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে আমিরাত। গত আড়াই মাসে দুবাই ও আবুধাবিসহ দেশটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা প্রায় ২ হাজার ৮০০টি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখোমুখি হয়েছে, যা আমিরাতের জন্য ‘সেপ্টেম্বর ১১’ এর মতো একটি বড় সংকট হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই নজিরবিহীন আক্রমণ আমিরাতকে তার জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুনর্বিবেচনা করতে এবং আঞ্চলিক মিত্রদের চেনার ক্ষেত্রে এক চূড়ান্ত মেরুকরণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এর ফলে সৌদি আরবসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আমিরাতের ভূরাজনৈতিক দূরত্ব আরও গভীর হয়েছে।
চলতি মে মাসের শুরুতেই আমিরাত সৌদি নেতৃত্বাধীন তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর প্রভাবশালী জোট ওপেক (OPEC) ত্যাগ করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। ইউএই-তে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত বারবারা লিফ নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, এই যুদ্ধ আমিরাতকে তাদের বন্ধু ও শত্রু চেনার ক্ষেত্রে এক কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে। যুদ্ধের শুরুতে ইরানের বিরুদ্ধে যৌথভাবে পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য কাতার ও সৌদির কাছে আবুধাবি বিশেষ অনুরোধ জানালেও তারা তাতে যোগ দেয়নি। পরবর্তীতে এপ্রিলের শুরুতে আমিরাত নিজস্ব উদ্যোগেই ইরানের লাভান দ্বীপসহ বেশ কয়েকটি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালায় এবং ২০২০ সালের আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের পর থেকে গড়ে ওঠা ইসরায়েলি সম্পর্ককে নতুন কৌশলগত রূপ দেয়।
ইরানি বোমাবর্ষণ প্রতিহত করতে ইসরায়েল ইতিমধ্যে আমিরাতকে তাদের অত্যাধুনিক ‘আয়রন ডোম’ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহ করেছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত মার্চে আবুধাবিতে একটি অত্যন্ত গোপন সফর সম্পন্ন করেছেন এবং দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় একটি বড় ধরনের কৌশলগত অগ্রগতি হয়েছে বলে দাবি করলেও আমিরাত তা অস্বীকার করেছে। তেহরান চলতি সপ্তাহে আমিরাতকে সরাসরি আগ্রাসনের সক্রিয় অংশীদার হিসেবে ঘোষণা করার পর আবুধাবি যেকোনো হামলা রুখে দিতে তাদের সার্বভৌম ও সামরিক অধিকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে।
রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (RUSI) গবেষক বুরচু ওজচেলিক জানিয়েছেন, এই যুদ্ধ মূলত মার্কিন-ইসরায়েল-ইউএই অক্ষকে অনেক বেশি শক্তিশালী রান্বিত করেছে। আমিরাতের রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ গত এপ্রিলে উল্লেখ করেছিলেন যে, ইরানি হামলা উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ও ইসরায়েলি প্রভাবকে আরও বৃদ্ধি করবে। তবে আরব বিশ্বে ইসরায়েলের গাজা অভিযানের মাঝে আমিরাতের এই গভীর সামরিক অংশীদারিত্ব দেশটির ভাবমূর্তি মারাত্মক সংকটে ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
আমিরাতের কর্মকর্তারা আরব লিগ এবং জিসিসি (GCC) এর মতো আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর দুর্বল ও নিষ্ক্রিয় ভূমিকার কারণে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে আমিরাতের বিপুল আর্থিক সহায়তায় টিকে থাকা পাকিস্তান তেহরানের প্রতি নরম সুর দেখানোয় আবুধাবি তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট। এছাড়া ইসরায়েলের সাথে এই নতুন অক্ষ গঠনের ফলে সুদানের বিদ্রোহী রেপিড সাপোর্ট ফোর্সেসকে (RSF) আমিরাতের সমর্থন দেওয়ার বিতর্কিত বিষয়টিও আন্তর্জাতিক স্তরে নতুন করে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
