ব্রেক্সিট গণভোটের ১০ বছর পর যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) পুনরায় যোগ দেওয়ার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসলেও এর জন্য দেশটিকে বিশাল অর্থনৈতিক মূল্য চোকাতে হবে বলে সতর্ক করেছেন সাবেক কূটনীতিকরা। ইইউ-তে নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের শেষ ইউরোপীয় কমিশনার স্যার জুলিয়ান কিং জানিয়েছেন, ব্রিটেন যদি ব্লকে ফিরে যেতে চায় তবে ব্রাসেলস তাদের কোনো বিশেষ ছাড় দেবে না। এর ফলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের ঐতিহাসিক বাজেট রেয়াত বা ছাড় হারাতে হবে দেশটিকে, যার আর্থিক মূল্য প্রতি বছর কমপক্ষে ৫ বিলিয়ন পাউন্ড।
এই বিশাল আর্থিক শর্তের কারণে ব্রিটিশ সরকারের জন্য পুনরায় ইইউ-এর সদস্যপদ নেওয়া অত্যন্ত জটিল হয়ে উঠবে।
সম্প্রতি ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রেসিডেন্ট রবার্টা মেতসোলা এক বিবৃতিতে জানান যে যুক্তরাজ্যের জন্য ইইউ-এর `দ্বার উন্মুক্ত` রয়েছে। তবে স্যার জুলিয়ান কিং স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে এই উন্মুক্ত দ্বারের অর্থ এই নয় যে ব্রিটেন আগের মতো সব বিশেষ সুবিধা ফিরে পাবে। ইইউ-তে ফিরতে হলে যুক্তরাজ্যকে ইউরোপজুড়ে নাগরিকদের অবাধ যাতায়াত বা ফ্রি মুভমেন্ট পুনরায় চালু করতে হবে এবং জোটের বার্ষিক বাজেটে বিশাল অঙ্কের অবদান রাখতে হবে। যারা পুনরায় যোগদানের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন, তাদের উচিত এই কঠিন শর্তগুলোর বাস্তবায়ন সম্পর্কে সাধারণ জনগণকে আগে থেকে স্পষ্ট ধারণা দেওয়া।
একই সুর শোনা গেছে সাবেক ইউরোপ বিষয়ক মন্ত্রী স্যার ডেভিড লিডিংটনের কণ্ঠেও। তিনি জানান, আগের শর্তে যদি সদস্যপদ ফিরে পাওয়া যেত তবে তিনি দ্বিধাহীনভাবে সেই প্রস্তাব লুফে নিতেন। কিন্তু মার্গারেট থ্যাচার ১৯৮৪ সালে ফ্রান্সের ফন্টেইনব্লো সম্মেলনে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর যে `বাজেট রেয়াত` আদায় করেছিলেন, তা ইইউ এবার কোনোভাবেই বহাল রাখবে না। তৎকালীন সময়ে যুক্তরাজ্যের কৃষি খাতে কম ভর্তুকি পাওয়ার ক্ষতিপূরণ হিসেবে এই রেয়াত দেওয়া হতো, যা ব্রেক্সিট পূর্ববর্তী শেষ বছরেও ব্রিটেনের প্রায় ৫ দশমিক ২ বিলিয়ন পাউন্ড সাশ্রয় করেছিল। ফলে এই ছাড় ছাড়া নতুন করে ইইউ-তে ফেরার চুক্তি ব্রিটিশ জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য করা অসম্ভব।
তাছাড়া ২০২০ সালে যুক্তরাজ্য যখন ইইউ ত্যাগ করে, তখন ব্লকের সাত বছর মেয়াদী বাজেট ছিল প্রায় এক ট্রিলিয়ন ইউরো। কিন্তু আগামী ২০২৮-২০৩৪ সালের নতুন বাজেট পরিকল্পনায় তা বাড়িয়ে দুই ট্রিলিয়ন ইউরো করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যার অর্থ দাঁড়ায় ইইউ-তে ফিরলে যুক্তরাজ্যকে আগের চেয়ে দ্বিগুণ বার্ষিক নেট অবদান রাখতে হবে। যদিও ইউরো মুদ্রা গ্রহণ করার জন্য ব্রাসেলস হয়তো এখনই চাপ দেবে না, তবে জোটের সাধারণ আইন ও শেনজেন নীতিমালার জটিলতাগুলো এড়ানো যাবে না। যুক্তরাজ্যের বাণিজ্য নীতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে আইসল্যান্ড, মন্টিনিগ্রো এবং আলবেনিয়ার মতো দেশগুলো ইইউ-তে যোগদানের প্রক্রিয়ায় থাকায় ব্রাসেলস যুক্তরাজ্যকে কোনো বিশেষ সুবিধা দিয়ে অন্য প্রার্থীদের ক্ষুব্ধ করতে চাইবে না।
এদিকে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার ব্রেক্সিট পরবর্তী এই বিতর্ক নিয়ে এখনই সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে এই আলোচনা হয়তো আরও অনেক বছর পর সামনে আসতে পারে। ডাউনিং স্ট্রিট আপাতত আগামী জুলাই মাসে ব্রাসেলসে অনুষ্ঠেয় যুক্তরাজ্য-ইইউ শীর্ষ সম্মেলনে একটি `রিসেট ডিল` বা সম্পর্ক পুনর্গঠন চুক্তির দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। এই চুক্তির মাধ্যমে যুবকদের অবাধ চলাচল, খাদ্য ও পানীয় বাণিজ্য সহজীকরণ এবং প্রতিরক্ষা খাতে যৌথ সহযোগিতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে। তবে আয়ারল্যান্ড সরকার ইতিমধ্যে জানিয়েছে যে তারা যুক্তরাজ্যকে পুনরায় ইইউ-তে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণভাবে ব্রিটিশ জনগণের ওপরই নির্ভর করছে।
