বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

হরমুজ প্রণালীতে ইরানের মিনি সাবমেরিন মোতায়েন, বাড়ছে উত্তেজনা

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ১৯, ২০২৬, ০৫:১১ পিএম

হরমুজ প্রণালীতে ইরানের মিনি সাবমেরিন মোতায়েন, বাড়ছে উত্তেজনা

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল জ্বালানি করিডোর হরমুজ প্রণালীতে তৈরি হয়েছে চরম সামরিক উত্তেজনা। বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর চলাচল প্রায় অবরুদ্ধ হয়ে পড়ার এই সংকটের মধ্যে ইরান তাদের নৌবাহিনীর অত্যাধুনিক ও মারাত্মক ‍‍`গাদির‍‍` শ্রেণির মিনি সাবমেরিন বা ক্ষুদ্র ডুবোজাহাজগুলো এই জলসীমায় মোতায়েন করেছে। ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান নেভির (আইআরআইএন) প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল শাহরাম ইরানি সম্প্রতি এই ছোট যুদ্ধজাহাজগুলোকে ‍‍`পারস্য উপসাগরের ডলফিন‍‍` হিসেবে অভিহিত করে তাদের সক্রিয় অবস্থানের কথা নিশ্চিত করেছেন।

এই ক্ষুদ্র কিন্তু অত্যন্ত বিপজ্জনক সাবমেরিনগুলোর মোতায়েন মূলত আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের কাছে বর্তমানে এই ধরণের প্রায় ২০টি ডিজেল-ইলেকট্রিক চালিত মিনি সাবমেরিন রয়েছে। এগুলো সাধারণ সাবমেরিনের তুলনায় আকারে বেশ ছোট, লম্বায় মাত্র ২৯ মিটার এবং ওজনে প্রায় ১৫০ টন। মাত্র সাতজন ক্রু বা নাবিক নিয়ে এই ডুবোজাহাজগুলো টানা সাত থেকে দশ দিন সমুদ্রের তলদেশে সম্পূর্ণ নিঃশব্দে অবস্থান করতে পারে। সবচেয়ে ভীতিজনক বিষয় হলো, প্রতিটি গাদির সাবমেরিন দুটি ভারী টর্পেডো এবং সামুদ্রিক মাইন দিয়ে সজ্জিত, যা যেকোনো বিশাল আকৃতির বাণিজ্যিক জাহাজ বা যুদ্ধজাহাজের তলদেশ এক আঘাতে উড়িয়ে দিয়ে সেটিকে সাগরে ডুবিয়ে দিতে সক্ষম।

ব্রিটিশ রাজকীয় নৌবাহিনীর সাবেক কমান্ডার টম শার্প জানিয়েছেন যে, এই মিনি সাবমেরিনগুলো সমুদ্রে একবার ডুব দিলে তাদের খুঁজে বের করা অত্যন্ত কঠিন। এর আগে ওমান উপসাগরে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী বহরের অ্যান্টি-সাবমেরিন ওয়ারফেয়ার কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি এই ইরানি ডুবোজাহাজগুলোর মুখোমুখি হয়েছিলেন। ব্রিটিশ পরমাণু চালিত সাবমেরিন ‍‍`এইচএমএস টারবুলেন্ট‍‍`-এর তৎকালীন ক্যাপ্টেন রয়ান রামসেও সাগরের তলদেশে এই মিনি সাবমেরিনগুলোর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। তারা দেখেছিলেন যে, এগুলো এককভাবে নয়, বরং অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে একে অপরের সাথে সমন্বয় করে পানির ঠিক নিচে আংশিক নিমজ্জিত অবস্থায় চলাচল করে।

পানির রঙে রাঙানো এই সাবমেরিনগুলোর সোনার বা রাডার সিগনেচার এতটাই ছোট যে, আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নিয়েও এদের সনাক্ত করা বেশ জটিল। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর অগভীর পানিতে এগুলো যখন ইঞ্জিনের গতি কমিয়ে সাগরের তলদেশে বসে থাকে, তখন আকাশ থেকে ছোঁড়া হালকা ওজনের টর্পেডো বা রকেট অনেক সময় এদের গায়ে সঠিকভাবে আঘাত করতে পারে না। তবে এই নন-নিউক্লিয়ার সাবমেরিনগুলোর বড় সীমাবদ্ধতা হলো এদের গতি। এগুলো যত দ্রুত চলার চেষ্টা করে, তত বেশি শব্দ তৈরি করে এবং এদের ব্যাটারির চার্জ দ্রুত শেষ হয়ে যায়, যা রিচার্জ করার জন্য এদের পুনরায় পানির উপরিভাগে আসতে হয়।

বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইরান এই ক্ষুদ্র ডুবোজাহাজগুলোকে ওমান উপকূলের অগভীর পানিতে মোতায়েন করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, যাতে পারস্য উপসাগরের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র এড়াতে চাওয়া জাহাজগুলোকে তারা ফাঁদে ফেলতে পারে। রয়্যাল নেভির সাবেক কমান্ডারদের মতে, হরমুজ প্রণালীতে ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলা কাউন্টার করার প্রযুক্তি পশ্চিমা যুদ্ধজাহাজগুলোর কাছে থাকলেও, এই অদৃশ্য মিনি সাবমেরিনগুলোর আক্রমণ প্রতিহত করা সবচেয়ে কঠিন। এটি যদি ইরানের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ বা অপপ্রচারও হয়ে থাকে, তবুও সাগরের বুকে এর প্রতিরোধক বা ডিটারেন্ট প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী এবং বাস্তবসম্মত।

banner
Link copied!