যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে পর্দা উঠতে যাওয়া ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের আসর ঘিরে ফুটবল বিশ্বের উত্তাপ ক্রমশ বাড়ছে। এবারের টুর্নামেন্টে সবচেয়ে আকর্ষণীয় গ্রুপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে গ্রুপ আই। এই গ্রুপে লড়াই করবে ফেভারিট ফ্রান্স, আফ্রিকার শক্তিধর সেনেগাল, আক্রমণাত্মক নরওয়ে এবং ডার্ক হর্স হিসেবে পরিচিত ইরাক। চারটি দলের খেলার ধরন সম্পূর্ণ আলাদা এবং কৌশলগত দিক থেকে একেকটি ম্যাচ এখানে প্রাণঘাতী লড়াইয়ের রূপ নেবে। মাঠের মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং রক্ষণভাগের দৃঢ়তাই শেষ পর্যন্ত এখানকার ভাগ্য নির্ধারণ করবে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ফ্রান্সকে এবারের টুর্নামেন্টের অন্যতম হট ফেভারিট মানছেন ফুটবল বিশ্লেষকরা। দিদিয়ে দেশমের নেতৃত্বে লেস ব্লুসরা যোগ্যতা পর্বে যেভাবে দাপট দেখিয়েছে, তা তাদের সামর্থ্যের পরিচয় দেয়। তাদের খেলার ধরন অসাধারণ এবং শক্ত রক্ষণভাগের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে দ্রুত পাল্টা আক্রমণে তারা অভ্যস্ত। শারীরিক শক্তি, গতি এবং বিশ্বমানের তারকাদের সঠিক মিশেলে তারা যেকোনো প্রতিপক্ষকে ছিন্নভিন্ন করে দিতে পারে। ধৈর্যের পরীক্ষায় যেমন তারা সফল, তেমনি হুট করে করা ঝড়ো আক্রমণেও তারা সমান পারদর্শী। তাদের এই বৈচিত্র্যই মূলত তাদের অন্য দলগুলোর চেয়ে এগিয়ে রাখে।
অন্যদিকে সেনেগাল এবারের আসরে আফ্রিকার হয়ে সবচেয়ে বড় আশার প্রতীক। লায়ন্স অব টেরাঙ্গা নামে পরিচিত এই দলটি ইউরোপের বিভিন্ন শীর্ষ ক্লাবের অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের নিয়ে গড়া। শারীরিক শক্তি, কৌশলগত শৃঙ্খলা এবং আক্রমণের গতির চমৎকার সমন্বয় রয়েছে তাদের মধ্যে। কোনো সান্ত্বনা নয়, তারা এবার শিরোপার লড়াইয়ে নামতে চায়। কোচ আলিউ সিসের নেতৃত্বে দলটি মাঠের প্রতিটি অংশেই শক্তিশালী। বিশেষ করে সাদিও মানে দলের আবেগের প্রতীক। আগের বিশ্বকাপে চোটের কারণে খেলতে না পারার আক্ষেপ তিনি এবার ঘোচাতে চাইবেন। সৌদি লিগে খেলে তিনি নিজেকে নতুন করে সাজিয়েছেন এবং এখন তিনি শুধু গোল করেন না, আক্রমণের ছন্দও নিয়ন্ত্রণ করেন।
নরওয়ে অনেকদিন পর বিশ্বকাপে ফিরেছে এবং নতুন প্রজন্মের এই দলটি ইউরোপীয় যোগ্যতা পর্ব পেরিয়েছে বিপুল আত্মবিশ্বাস নিয়ে। তাদের অভিজ্ঞতার অভাব থাকলেও আক্রমণভাগ বিশ্বের যেকোনো রক্ষণকে ভয় দেখাতে পারে। মাঝমাঠে কারিগরি দক্ষতা এবং দ্রুত পাসিংয়ের মাধ্যমে তারা প্রতিপক্ষের জন্য বিপদ তৈরি করে। রক্ষণে কিছুটা দুর্বলতা থাকলেও আক্রমণে তারা মারাত্মক। এই দলের মূল ভরসা আরলিং হলান্ড। ক্লাব ফুটবলে রেকর্ড ভাঙা এই স্ট্রাইকার জাতীয় দলে ভিন্ন ভূমিকায় খেলেন। সুযোগ কম পেলেও একটি সুযোগকেই গোলে পরিণত করার ক্ষমতা তার অসাধারণ। শারীরিক শক্তি আর পজিশনিংয়ের মাধ্যমে তিনি যেকোনো দলের রক্ষণকে তছনছ করে দিতে পারেন।
ইরাক অবশ্য এই গ্রুপের ডার্ক হর্স। মেসোপটেমিয়ার সিংহরা প্লে-অফ জিতে এসেছে ইতিহাস গড়ে। তাদের কোনো বিশ্বসেরা তারকা নেই, কিন্তু তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সুশৃঙ্খল রক্ষণ এবং সেট পিসে তাদের দক্ষতা। বড় দলগুলোকে বিরক্ত করার সব উপকরণই তাদের কাছে রয়েছে। গ্রুপের শেষ দিনে ফ্রান্স-নরওয়ের লড়াই হবে এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম বড় আকর্ষণ। কিলিয়ান এমবাপে আর আরলিং হলান্ডের মুখোমুখি লড়াই ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত ব্যক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এমবাপে এখন আর শুধু তরুণ প্রতিভা নন, তিনি দলের কেন্দ্রবিন্দু এবং নেতা। বাঁ-পাশ থেকে ভেতরে ঢুকে আসা তার স্বাভাবিক খেলা এবং গতি ও ফিনিশিংয়ের অসাধারণ মিশ্রণ তাকে সেরাদের কাতারে রেখেছে। সব মিলিয়ে গ্রুপ আই-এর লড়াই হতে যাচ্ছে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম কৌশলগত যুদ্ধ।
