বিশ্বসেরা ধনকুবের এবং টেসলার সিইও ইলন মাস্ক এখন যেন এক আইনি গোলকধাঁধায় আটকে আছেন। একের পর এক মামলা করছেন, আইনি লড়াই লড়ছেন এবং প্রায় প্রতিটিতেই হারছেন। ওপেনএআই-এর স্যাম অল্টম্যানের কাছে তার সর্বশেষ আইনি পরাজয় এই তালিকার নবীনতম সংযোজন। এর আগে এক্সের (সাবেক টুইটার) কর্মী এবং বিনিয়োগকারীদের করা দুটি আলাদা মামলাতেও তাকে বড় ধাক্কা খেতে হয়েছে।
কিন্তু এত হারের পরও মাস্ক কেন আইনি লড়াইয়ে মরণপণ লড়ে যাচ্ছেন?
বিশ্লেষকদের মতে, মাস্কের এই কর্মকাণ্ড কোনো সাধারণ জেদ নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে সুদূরপ্রসারী ব্যবসায়িক স্ট্র্যাটেজি। ২০২২ সালে টুইটার কিনে নেওয়ার পর ব্যাপক কর্মী ছাঁটাই করেছিলেন তিনি। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ, বোনাস ও বকেয়া বেতন না দেওয়ায় তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। আদালতে প্রাথমিক লড়াই চালালেও পরবর্তীতে মোটা অংকের সেটলমেন্ট বা সমঝোতা করতে বাধ্য হন তিনি। মূলত সেটি ছিল এক প্রকার পরাজয় স্বীকার। চলতি বছরের মার্চ মাসে এক্সের বিনিয়োগকারীদের করা অন্য একটি মামলাতেও হেরে যান তিনি। বিজ্ঞাপনদাতার সংখ্যা কমে যাওয়ায় মাস্ক পাল্টা মামলা ঠুকেছিলেন, কিন্তু সেখানেও কোনো বিজয় আসেনি।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকারে সরকারি খরচ ও ব্যয় সংকোচন বিভাগের প্রধান হিসেবে নতুন বিতর্কেও জড়ান তিনি।
অভিযোগ ওঠে, যেসব সংস্থার সঙ্গে তার মতাদর্শ মেলে না, তাদের অনুদান বাতিল করে দিয়েছেন তিনি। এই প্রেক্ষিতে করা মামলায় আদালতে তীব্র ভর্ৎসনার মুখে পড়তে হয় তাকে। ওপেনএআই-এর বিরুদ্ধে করা মামলায় তো বিচারকের সরাসরি প্রশ্নের মুখেই পড়েছিলেন এই ধনকুবের। এরপরও তিনি থামছেন না। অনেকের মতে, মামলা মানেই মিডিয়ার স্পটলাইটে থাকা। মাস্ক আদালতকে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে অত্যন্ত পটু।
তিনি নিজের সমর্থকদের কাছে তার ইমেজকে ‘একজন লড়াকু যোদ্ধা’ হিসেবে তুলে ধরেন।
শত্রুর বিরুদ্ধে মামলা করার ক্ষেত্রে অনেক বিশেষজ্ঞ তার সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মিল খুঁজে পান। মাস্ক জানেন, আইনি লড়াই তার প্রচারের আলোয় থাকার অন্যতম মাধ্যম। স্পেসএক্স-কে শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত করার আগে তিনি কৌশলে এই পরিস্থিতি তৈরি করে রেখেছেন। প্রচলিত নিয়ম ভাঙায় অভ্যস্ত এই ধনকুবের জানেন, পরিস্থিতির যত নেতিবাচক প্রভাবই পড়ুক না কেন, শেষ পর্যন্ত তিনি কাদা ঝেড়ে ঠিকই বেরিয়ে আসবেন।
আইনি লড়াই যেন তার ব্যবসার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
পরিস্থিতি যেমনই হোক, মাস্ক কখনো বদনামের গায়ে দাগ কাটার সুযোগ দেন না। তিনি তার চেনা ছন্দে ফিরে আসেন। এই মামলার পর আরেকটি নতুন বিতর্ক বা মামলার জন্ম দিয়ে তিনি জনস্রোতের মনোযোগ নিজের দিকেই ধরে রাখেন। এটি ব্যবসায়িক পরিভাষায় এক প্রকার কৌশলগত অস্থিরতা তৈরি করা।
কেউ কেউ বলেন এটি তার অহংকারের বহিঃপ্রকাশ, কেউ বলেন এটি গভীর রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার, ইলন মাস্ক সহজে থামার পাত্র নন। মামলায় হেরে যাওয়া বা ভর্ৎসনার শিকার হওয়া তার দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য থেকে তাকে বিচ্যুত করতে পারে না। তিনি মামলার মাধ্যমেই নিজের প্রভাব ও শক্তির জানান দিয়ে যাচ্ছেন।
আদালত এখন তার কাছে এক ধরণের বড় রিং, যেখানে তিনি কেবল লড়ছেন না, বরং নিজের সাম্রাজ্যের বিজ্ঞাপন করছেন।
এই রণকৌশল কতদিন টেকসই হবে, তা নিয়ে সংশয় থাকলেও মাস্ক আপাতত এই পথে হাঁটতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন। তার প্রতিটি পরাজয় যেন এক একটি নতুন গল্পের জন্ম দিচ্ছে। মিডিয়ার শিরোনামে থাকাটাই যেন তার সবচেয়ে বড় সাফল্য। আইনি মারপ্যাঁচে তিনি নিজেকে লড়াকু ইমেজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সফল হয়েছেন। আর এই ইমেজই তার পরবর্তী ব্যবসায়িক লক্ষ্যের প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে।
