বিশ্বের তৈরি পোশাক শিল্পে দীর্ঘকাল ধরে মানুষের হাতের ছোঁয়া অপরিহার্য হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসলেও আধুনিক রোবটিক্স প্রযুক্তি এখন সেই ধারা বদলে দেওয়ার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েছে। গাড়ি সংযোজন, জটিল অস্ত্রোপচার কিংবা বিমানবন্দরের পণ্য ওঠানামার কাজে রোবট ব্যাপকভাবে সফল হলেও নমনীয় কাপড়ের টুকরো সুঁই-সুতা দিয়ে নিখুঁতভাবে সেলাই করা রোবটের জন্য সবসময়ই একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। এই জটিলতার কারণে ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ক্রিয়েটমি সম্পূর্ণ নতুন এক পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছে, যেখানে সেলাইয়ের পরিবর্তে বিশেষ আঠার সাহায্যে তৈরি হচ্ছে পোশাক।
এই স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির কারণে বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ পোশাক শ্রমিকের কর্মসংস্থান গভীর ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
বর্তমানে বিশ্ববাজারে বিক্রি হওয়া সিংহভাগ পোশাকই এশিয়ার স্বল্প আয়ের শ্রমিকদের হাত ধরে তৈরি হয়। ক্রিয়েটমি-র প্রধান নির্বাহী ক্যাম মায়ার্স জানান, সেলাই করার সময় কাপড়ের দুটি অংশকে গতিশীল অবস্থায় এক লাইনে রাখা রোবটের পক্ষে কঠিন, তাই তারা কাপড়ের জোড়া লাগানোর জন্য তাপ-নিয়ন্ত্রিত বিশেষ আঠা ব্যবহার করছেন। এই প্রক্রিয়ায় রোবট আঠা প্রয়োগের পর কাপড়ের ওপর আরেকটি অংশ স্থাপন করে কেবল স্ট্যাম্প বা চাপ দিয়ে সিল করে দেয়। ইতিমধ্যে এই পদ্ধতিতে অন্তর্বাস তৈরি শুরু হয়েছে এবং আগামী কয়েক মাসের মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে টি-শার্ট উৎপাদন শুরু হবে বলে প্রতিষ্ঠানটি নিশ্চিত করেছে।
পোশাক শিল্পে এই অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু হলে পশ্চিমা দেশগুলো তাদের প্রয়োজনীয় পোশাক নিজেদের দেশেই উৎপাদন করতে পারবে। এর ফলে উৎপাদন যেমন দ্রুত হবে, তেমনি বৈশ্বিক পরিবহন খরচ ও পরিবেশগত ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। তবে এর বিপরীত পিঠও অত্যন্ত অন্ধকার, কারণ এর ফলে এশিয়ার বিশাল পোশাক শিল্পখাতে কর্মরত কোটি কোটি প্রান্তিক মানুষ রাতারাতি বেকার হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। যুক্তরাজ্যের বাজারে বর্তমানে বিক্রি হওয়া পোশাকের মাত্র অল্প কিছু অংশ নিজেদের দেশে তৈরি হয়, বাকি সবই আমদানি করতে হয়।
ক্রিয়েটমি যে বিশেষ আঠা ব্যবহার করছে তা ওয়াশিং মেশিনের গরম পানি কিংবা ইস্ত্রির তাপে গলে যাবে না বলে দাবি করেছেন গবেষকরা। যেহেতু এই পোশাকে কোনো প্রথাগত সেলাইয়ের সুতা থাকে না, তাই এগুলো মানুষের শরীরের গড়ন অনুযায়ী নিখুঁতভাবে থার্মোসেট ছাঁচে তৈরি করা সম্ভব। তবে ফ্যাশন জগতে প্রতিদিনের পরিবর্তনশীল নকশা ও বৈচিত্র্যময় রঙের পোশাক তৈরিতে রোবট কতটা সফল হবে, তা নিয়ে এখনো বড় ধরণের সংশয় রয়ে গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি প্রতিষ্ঠান সফটওয়্যার অটোমেশনও নিজস্ব সেলাই রোবটের তৃতীয় প্রজন্ম বাজারে আনার ঘোষণা দিয়েছে, যা আমদানির সমপরিমাণ খরচে স্থানীয়ভাবে টি-শার্ট তৈরি করতে পারবে।
বিশাল এই পোশাক বাজারের বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার কারণে প্রযুক্তি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের রোবটের অভ্যন্তরীণ কার্যপ্রণালী নিয়ে অত্যন্ত গোপনীয়তা রক্ষা করছে। এদিকে মহামারী এবং সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিশ্বজুড়ে তৈরি পোশাক কারখানাগুলো ইতিমধ্যে কাঁচামালের সংকটে ভুগছে। যদিও রোবটিক্স শিল্পের প্রতিনিধিরা প্রায়ই দাবি করেন যে এই অটোমেশনের ফলে সাধারণ শ্রমিকরা আরও উচ্চ আয়ের এবং কম ক্লান্তিকর পেশায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবেন, তবে বাস্তবে এই বিশাল শ্রমবাজারের বিকল্প কর্মসংস্থান রাতারাতি তৈরি করা প্রায় অসম্ভব।
