যুক্তরাজ্যভিত্তিক বহুজাতিক ব্যাংকিং জায়ান্ট স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড তাদের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধির অংশ হিসেবে হাজার হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে তাদের সামগ্রিক ব্যাক-অফিস ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা খাতের ১৫ শতাংশের বেশি কর্মী কমিয়ে আনা হবে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে ব্যাংকটির বিভিন্ন অপারেশনাল সেন্টারে কর্মরত প্রায় ৭ হাজার ৮০০ মানুষ সরাসরি তাদের বর্তমান চাকরি হারাবেন।
এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বিশ্বব্যাপী এআই প্রযুক্তির কারণে কর্মী ছাঁটাই করা অন্যতম প্রধান বৈশ্বিক ব্যাংকে পরিণত হলো।
ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিল উইন্টার্স হংকংয়ে বিনিয়োগকারীদের এক সম্মেলনে এই নতুন বৈশ্বিক কৌশলপত্র প্রকাশ করেন। তিনি সাংবাদিকদের জানান, এটি কোনো সাধারণ খরচ কমানোর প্রক্রিয়া নয়, বরং কম গুরুত্বপূর্ণ মানব পুঁজির পরিবর্তে আধুনিক আর্থিক ও বিনিয়োগ প্রযুক্তির প্রতিস্থাপন। এই স্বয়ংক্রিয় রূপান্তরের মূল লক্ষ্য হলো ২০২৮ সালের মধ্যে প্রতি কর্মীর উৎপাদনশীলতা ও আয় প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি করা। তবে ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের একটি অংশকে ব্যাংকের অন্যান্য শাখায় বা ভিন্ন পদে স্থানান্তর করার চেষ্টা চালানো হবে বলে ভেতরের সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের এই বিশাল ছাঁটাই প্রক্রিয়া মূলত ভারত, মালয়েশিয়া এবং পোল্যান্ডে অবস্থিত তাদের প্রধান ব্যাক-অফিস কেন্দ্রগুলোতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলবে। এর মধ্যে চেন্নাই, বেঙ্গালুরু, কুয়ালালামপুর এবং ওয়ারশ শহরের কর্মীরা সরাসরি এই প্রযুক্তিগত স্থানান্তরের মুখে পড়বেন। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে, তারা প্রক্রিয়াগুলোকে আরও সহজ করতে, সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং গ্রাহক সেবা উন্নত করতে অ্যাডভান্সড অ্যানালিটিক্স ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি করছে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ব্যাংকটিতে প্রায় ৮২ হাজার কর্মী কাজ করছেন, যার মধ্যে ৫২ হাজারেরও বেশি মানুষ এই করপোরেট ব্যাক-অফিস সেবায় নিয়োজিত।
প্রযুক্তির অগ্রগতির কারণে আর্থিক খাতে কর্মী ছাঁটাইয়ের এই প্রবণতা কেবল স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি একটি বৈশ্বিক তরঙ্গে পরিণত হয়েছে। এর আগে সিঙ্গাপুরের সবচেয়ে বড় ব্যাংক ডিবিএস আগামী তিন বছরের মধ্যে তাদের প্রায় ৪ হাজার চুক্তিভিত্তিক ও খণ্ডকালীন পদ বিলুপ্ত করার ঘোষণা দিয়েছিল। এছাড়া মেটা, আমাজন এবং ওরাকলের মতো শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রকল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধির অজুহাতে ইতিমধ্যে হাজার হাজার কর্মীকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দিয়েছে। বিশেষ করে মেটা তাদের মোট কর্মীবাহিনীর ১০ শতাংশ বা প্রায় ৮ হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
নতুন এই স্ট্র্যাটেজি বা কৌশলপত্র প্রকাশের পর হংকংয়ের শেয়ার বাজারে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের শেয়ারের দাম প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা চলতি বছরে তাদের সামগ্রিক বাজার মূলধনকে শক্তিশালী করেছে। ব্যাংকটি আশা করছে, এই এআই ভিত্তিক রূপান্তরের ফলে ২০২৮ সালের মধ্যে তাদের মুনাফার হার ১৫ শতাংশ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে তা ১৮ শতাংশে উন্নীত হবে। তবে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, ফ্রন্টলাইন ও ব্যাক-অফিস সেবায় মানুষের কাজের ক্ষেত্র যেভাবে মেশিনের দখলে চলে যাচ্ছে, তা বিশ্বজুড়ে শিক্ষিত তরুণ ও নতুন গ্র্যাজুয়েটদের কর্মসংস্থানের সুযোগ মারাত্মকভাবে সংকুচিত করবে।
