বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

ওপেনএআই মামলায় হারলেন ইলন মাস্ক, তবুও আপিলের ঘোষণা

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ১৯, ২০২৬, ০৩:৫৫ পিএম

ওপেনএআই মামলায় হারলেন ইলন মাস্ক, তবুও আপিলের ঘোষণা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির খাতের সবচেয়ে আলোচিত আইনি লড়াইয়ে চ্যাটজিপিটি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই এবং এর প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যানের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় হেরে গেছেন বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক। ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডের একটি ফেডারেল আদালতের জুরি বোর্ড সোমবার এই ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেছে। মাত্র দুই ঘণ্টারও কম সময় আলোচনার পর সর্বসম্মতভাবে জুরিরা জানান যে ওপেনএআই-এর বিরুদ্ধে মাস্কের আনা চুক্তিভঙ্গের সমস্ত অভিযোগ আইনি সময়সীমা পার হওয়ার পর দায়ের করা হয়েছে।

এই রায়ের পরপরই মার্কিন ডিস্ট্রিক্ট জাজ ইভন গনজালেস রজার্স মাস্কের করা ১৩৪ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণের মামলাটি সরাসরি খারিজ করে দেন।

আদালতের এই সিদ্ধান্ত মূলত ওপেনএআই-এর জন্য এক বিশাল স্বস্তি নিয়ে এসেছে, যা প্রতিষ্ঠানটিকে চলতি বছরের শেষের দিকে প্রায় এক ট্রিলিয়ন বা এক লাখ কোটি ডলার বাজার মূল্যায়নে শেয়ার বাজারে (আইপিও) যাওয়ার পথ পরিষ্কার করে দিল। কিন্তু এই বড় ধাক্কার পরও আইনি লড়াই থেকে পিছিয়ে আসার কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছেন না ইলন মাস্ক। রায়ের পরপরই নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় মাস্ক এই রায়কে একটি ‍‍`ভয়ানক নজির‍‍` বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি দাবি করেন যে আদালত মামলার মূল গুণাগুণ বিচার না করে কেবল ক্যালেন্ডারের কারিগরি ত্রুটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে এবং তিনি এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করবেন।

মামলাটির মূল বিতর্ক ছিল ওপেনএআই-এর আদি অলাভজনক বা দাতব্য চরিত্রকে কেন্দ্র করে। ২০১৫ সালে মাস্ক ও অল্টম্যান মিলে যখন এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলেন, তখন লক্ষ্য ছিল মানবজাতির কল্যাণে নিরাপদ এআই তৈরি করা। কিন্তু ২০২৪ সালে দায়ের করা মামলায় মাস্ক অভিযোগ করেন যে স্যাম অল্টম্যান এবং কোম্পানির প্রেসিডেন্ট গ্রেগ ব্রকম্যান মাইক্রোসফটের কাছ থেকে শত কোটি ডলার বিনিয়োগ নিয়ে গোপনে প্রতিষ্ঠানটিকে একটি অতি-মুনাফাভোগী বাণিজ্যিক সংস্থায় রূপান্তর করেছেন, যা আক্ষরিক অর্থেই একটি দাতব্য সংস্থাকে চুরি করার শামিল। ওয়ানএআই-এর আইনজীবীরা অবশ্য যুক্তি দেখিয়েছেন যে মাস্ক মূলত একজন ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ঈর্ষাকাতর হয়ে তাদের প্রযুক্তিগত অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করতে এই মামলা করেছিলেন।

আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে আদালতে মাস্কের একের পর এক পরাজয়ের তালিকায় এটি সর্বশেষ সংযোজন। এর আগে তিনি এক্স প্ল্যাটফর্মের সাবেক নির্বাহী ও হাজার হাজার কর্মীর বকেয়া বেতন সংক্রান্ত মামলা স্যাটল বা রফা করতে বাধ্য হয়েছেন, বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করার মামলায় হেরেছেন এবং বিজ্ঞাপনদাতাদের বিরুদ্ধে করা তার আরেকটি মামলা আদালত সরাসরি ছুড়ে ফেলেছে। এছাড়া টেসলা মোটরসের শত কোটি ডলারের বেতন প্যাকেজ বাতিল হওয়া এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যয় সংকোচন বিভাগের হয়ে নেওয়া কিছু পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আদালতের নিষেধাজ্ঞা মাস্কের আইনি সক্ষমতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। তবে বিশ্বজুড়ে তার অঢেল সম্পদ এবং অদম্য করপোরেট প্রভাবের কারণে এই জরিমানা বা পরাজয়গুলো তার মামলা করার প্রবণতাকে দমাতে পারছে না।

১১ দিনব্যাপী চলা এই চাঞ্চল্যকর ট্রায়াল বা শুনানিতে সিলিকন ভ্যালির দুই শীর্ষ টাইটানের ব্যক্তিগত কাদা ছোড়াছুড়ি এবং বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে। আদালতে জুরিদের সামনে ওপেনএআই-এর আইনজীবীরা প্রমাণ করতে সক্ষম হন যে মাস্ক ২০১৭ সাল থেকেই কোম্পানির বাণিজ্যিক রূপান্তরের পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত ছিলেন, ফলে তিন বছরের আইনি সময়সীমা বা স্ট্যাটিউট অব লিমিটেশন অনেক আগেই পার হয়ে গেছে। এদিকে মাস্ক তার অন্য প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স-এর শেয়ার বাজারে যাওয়ার ঐতিহাসিক ঘোষণার মধ্যেই এই আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। সমালোচকরা মনে করছেন, মার্কিন রাজনীতি ও অর্থনীতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো ব্যক্তিত্বদের মতোই মাস্কের গায়েও কোনো নেতিবাচক আইনি আদেশ দীর্ঘস্থায়ী দাগ ফেলতে পারছে না, যার কারণে তিনি প্রতিটি পরাজয়ের পরও পুনরায় নতুন করে আইনি লড়াইয়ের ঘোষণা দিয়ে চলেছেন।

banner
Link copied!