কেনিয়ার একটি নির্জন হ্রদের ধারে দৃশ্যটি ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক। মাত্র কয়েক দিন বয়সের একটি শিশু জলহস্তী তার মৃত মায়ের নিথর শরীরের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। মা নড়ছে না দেখে বারবার তাকে ধাক্কা দিয়ে জাগানোর চেষ্টা করছিল অবুঝ ছানাটি। গত সপ্তাহের শেষে কেনিয়ার বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কর্মকর্তাদের চোখে পড়ার পর শুরু হয় এক রুদ্ধশ্বাস উদ্ধার অভিযান। মা-হারা এই অনাথ জলহস্তী ছানাটির নাম রাখা হয়েছে ‘বাম্পি’। বর্তমানে কেনিয়ার একটি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে মানুষের স্নেহে এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণে বেড়ে উঠছে সে।
কেনিয়ার বন্যপ্রাণী সেবা বিভাগ (কেডাব্লিউএস) জানিয়েছে, মৃত মা জলহস্তীটির শরীরে কিছু আঘাতের চিহ্ন ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, কোনো বন্য প্রাণীর আক্রমণ অথবা প্রজনন মৌসুমে কোনো পুরুষ জলহস্তীর সাথে লড়াইয়ে সে মারাত্মকভাবে জখম হয়েছিল। সম্ভবত সন্তানকে রক্ষা করতে গিয়েই মা জলহস্তীটি তার জীবন হারিয়েছে। কেডাব্লিউএস-এর কর্মকর্তাদের মতে, বন্য পরিবেশে এমন ঘটনা বিরল হলেও একেবারে অস্বাভাবিক নয়। তবে মায়ের পচনশীল মরদেহের পাশ থেকে কয়েক দিন বয়সী এই ছানাটিকে আলাদা করা ছিল এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। শিশুটি তার মাকে ছেড়ে কোনোভাবেই আসতে চাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত অনেক কৌশলে তাকে উদ্ধার করে রাজধানী নাইরোবিতে নিয়ে আসা হয়।
বাম্পির উদ্ধারের পর তার জন্য এগিয়ে আসে আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিসম্পন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘শেলড্রিক ওয়াইল্ডলাইফ ট্রাস্ট’। উদ্ধারের প্রথম রাতে ছানাটিকে নাইরোবির একটি নার্সারিতে রাখা হয়েছিল। সেখানে তাকে গরম কম্বলে মুড়িয়ে পরম যত্নে দুধ খাওয়ানো হয়। সংস্থাটি জানিয়েছে, বাম্পি তখন মানসিকভাবে অত্যন্ত বিপর্যস্ত ছিল এবং একটুখানি স্পর্শ বা স্নেহের জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়ছিল। এরপর তাকে হেলিকপ্টারে করে কেনিয়ার টিসাভো ইস্ট ন্যাশনাল পার্কের কাছে কালুকু অভয়ারণ্যে স্থানান্তরিত করা হয়। সেখানেই এখন বাম্পির নতুন ঠিকানা।
কালুকু অভয়ারণ্যে বাম্পির জন্য তৈরি করা হয়েছে বিশেষ কৃত্রিম পুকুর। আথি নদীর তীরে অবস্থিত এই অভয়ারণ্যে বাম্পি একা নয়। তার সাথে চব্বিশ ঘণ্টা সময় কাটাচ্ছেন একজন প্রশিক্ষিত বনরক্ষী। জলহস্তীরা সাধারণত দিনের অধিকাংশ সময় পানির নিচে থাকতে পছন্দ করে। বাম্পিও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, সে তার রক্ষীকে ছেড়ে এক মুহূর্ত থাকতে চায় না। সংস্থাটি সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ছবি শেয়ার করেছে যেখানে দেখা যাচ্ছে, বাম্পি তার মাথাটি পরম শান্তিতে তার রক্ষীর কোলে রেখে চোখ বুজে আছে। রক্ষীরা জানিয়েছেন, বাম্পি অত্যন্ত স্নেহপ্রবণ একটি প্রাণী এবং কারো গায়ে ঘেঁষে থাকতেই সে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে।
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃতিতে জলহস্তী ছানারা এক বছর বা তার বেশি সময় ধরে মায়ের দুধ পান করে। তবে তারা বয়ঃসন্ধি না আসা পর্যন্ত মায়ের সাথে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে লেগে থাকে। বাম্পির ক্ষেত্রে সেই অভাব পূরণ করার চেষ্টা করছেন শেলড্রিকের কর্মীরা। তবে কাজটা সহজ নয়। এর আগে ২০১৬ সালে ‘হামফ্রেটা’ নামের একটি অনাথ জলহস্তী উদ্ধার করা হলেও ছয় মাস পর সে মারা গিয়েছিল। জলহস্তী ছানাদের হাত দিয়ে খাওয়ানো এবং বড় করা বেশ জটিল প্রক্রিয়া। তবে কেডাব্লিউএস আশাবাদী যে সঠিক পুষ্টি এবং সঠিক পরিবেশ পেলে বাম্পি সুস্থ হয়ে উঠবে।
কালুকু অভয়ারণ্যে বাম্পির সাথে আরও একটি জলহস্তী ছানা রয়েছে যার বয়স প্রায় এক বছর। তবে বর্তমানে তাদের আলাদা রাখা হয়েছে। শেলড্রিক ওয়াইল্ডলাইফ ট্রাস্টের মূল লক্ষ্য হলো এই প্রাণীগুলোকে এমনভাবে বড় করা যাতে তারা তাদের স্বাভাবিক প্রবৃত্তিগুলো ভুলে না যায়। যখন বাম্পি যথেষ্ট বড় এবং শক্তিশালী হয়ে উঠবে, তখন তাকে পুনরায় বনের উন্মুক্ত পরিবেশে তার স্বগোত্রীয়দের মাঝে ছেড়ে দেওয়া হবে। সংস্থাটি ১৯৭৭ সাল থেকে অনাথ হাতি এবং গণ্ডার উদ্ধারে কাজ করলেও জলহস্তী সংরক্ষণেও তারা এখন উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখাচ্ছে।
বাম্পির এই বেঁচে ফেরার গল্পটি কেবল একটি উদ্ধারের কাহিনী নয়, বরং এটি বন্যপ্রাণী ও মানুষের মধ্যে যে গভীর সংযোগ তৈরি হতে পারে তার এক জীবন্ত উদাহরণ। কেনিয়ার রুক্ষ সাভানা অঞ্চলে যেখানে বেঁচে থাকা প্রতিটি মুহূর্তের লড়াই, সেখানে বাম্পির মতো একটি প্রাণের রক্ষা পাওয়া বন্যপ্রাণী প্রেমীদের মনে নতুন আশা জাগিয়েছে। এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা, কখন বাম্পি তার আপনালয়ে ফিরে নিজের রাজ্যের রাজা হয়ে উঠবে।
