মাদকদ্রব্য ও সাইকোট্রপিক উপাদানের অবৈধ পাচার এবং অপব্যবহার রোধে একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান সরকার। শুক্রবার ৮ মে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে দুই দেশের মধ্যে এই সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তির আওতায় আগামী ১০ বছর মাদক পাচার ও মাদক সংশ্লিষ্ট অর্থপাচার রোধে ঢাকা ও ইসলামাবাদ একে অপরকে সরাসরি গোয়েন্দা তথ্য ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করবে। এই সহযোগিতার মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় মাদকের রুটগুলো বন্ধ করা সম্ভব হবে বলে উভয় পক্ষই আশাবাদ ব্যক্ত করেছে।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং পাকিস্তানের পক্ষে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (ইন্টেরিয়র মিনিস্টার) সৈয়দ মহসিন রাজা নাকভি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। চুক্তির শর্তানুসারে, দুই দেশ মাদক পাচারকারী ব্যক্তি, আন্তর্জাতিক মাদক অপরাধী সংগঠন (DTOs) এবং মাদক লুকানোর অভিনব পদ্ধতি সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য বিনিময় করবে। এর ফলে সমুদ্র বা আকাশপথে মাদকের বড় চালানগুলো শনাক্ত করা সহজ হবে। বিশেষ করে মাদক ব্যবসার মাধ্যমে যে বিশাল অঙ্কের অর্থপাচার বা মানি লন্ডারিং হয়, তা নিয়ন্ত্রণে দুই দেশের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করবে।
এই সমঝোতা স্মারকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘কন্ট্রোলড ডেলিভারি অপারেশন’। এর মাধ্যমে এক দেশের গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অন্য দেশ মাদক পাচারকারীদের হাতেনাতে ধরার সুযোগ পাবে। এছাড়া মাদক শনাক্তকরণের জন্য আধুনিক প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম এবং স্নিফার ডগ ব্যবহারের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের বিষয়টিও চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মাদকের অপব্যবহার রোধে কেবল দমনমূলক ব্যবস্থা নয়, বরং বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফল বিনিময় এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উন্নত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, নিয়মিত ও অপারেশনাল তথ্য বিনিময়ের জন্য বাংলাদেশের পক্ষে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (DNC) এবং পাকিস্তানের পক্ষে অ্যান্টি-নারকোটিক্স ফোর্স (ANF) ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে কাজ করবে। উভয় পক্ষই আদান-প্রদানকৃত সব তথ্য ও নথিপত্রের কঠোর গোপনীয়তা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। চুক্তিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, কোনো তথ্যই তৃতীয় কোনো পক্ষকে জানানো হবে না। প্রাথমিকভাবে এই চুক্তির মেয়াদ ১০ বছর নির্ধারণ করা হলেও পরবর্তীতে উভয় দেশের সম্মতির ভিত্তিতে এটি বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে।
অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, মাদক কেবল একটি অপরাধ নয়, এটি একটি সামাজিক ব্যাধি যা তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংস করছে। এই চুক্তির মাধ্যমে আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো। অন্যদিকে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন রাজা নাকভি জানান, মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই কোনো একক দেশের পক্ষে সম্ভব নয়, এর জন্য আন্তর্জাতিক ও দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা অপরিহার্য। এই সমঝোতা স্মারক দক্ষিণ এশিয়ায় মাদকের আন্তঃদেশীয় নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
