ভারতের লোকসভার বিরোধী দলীয় নেতা রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে এক নজিরবিহীন ও চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তুলেছেন যা দেশটির রাজনৈতিক মহলে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। শুক্রবার ৮ মে গুরুগ্রামে আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি দাবি করেন যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বর্তমানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন। রাহুল গান্ধীর মতে ভারতের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এখন মার্কিন প্রশাসনের হাতের মুঠোয় চলে গেছে। জনসভায় দেওয়া বক্তৃতায় তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষা ব্যবহার করে বলেন যে ট্রাম্প যদি নরেন্দ্র মোদিকে এখন লাফ দিতে বলেন তবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন ছাড়াই সেই নির্দেশ পালন করবেন।
রাহুল গান্ধীর এই আক্রমণের মূলে রয়েছে আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত ও বিতর্কিত ‘জেফরি এপস্টাইন ফাইল’। কংগ্রেস নেতা দাবি করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্রে সংরক্ষিত প্রায় সাড়ে তিন লাখ গোপন নথিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ‘ইতিহাস ও চরিত্র’ সংক্রান্ত এমন কিছু সংবেদনশীল তথ্য রয়েছে যা ট্রাম্প প্রশাসন ব্ল্যাকমেইল করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। রাহুল অভিযোগ করেন যে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মেও দাবি করেছেন যে তিনি চাইলে মাত্র এক মিনিটে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দিতে পারেন। যদিও এ বিষয়ে রাহুল গান্ধী সরাসরি কোনো দালিলিক প্রমাণ সভায় উপস্থাপন করেননি তবে তার এই মন্তব্য ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
সাম্প্রতিক ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির তীব্র সমালোচনা করে রাহুল গান্ধী বলেন যে এই চুক্তি কোনো সহযোগিতার দলিল নয় বরং এটি ভারতের ওপর চাপিয়ে দেওয়া একটি শর্ত। তার দাবি অনুযায়ী এই চুক্তির মাধ্যমে ভারতের কৃষি খাত, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ ‘ডিজিটাল ডাটা’ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। কোনো স্বাধীন দেশের প্রধানমন্ত্রী এমন অসম চুক্তি করতে পারেন না যদি না তিনি কোনো গভীর চাপে থাকেন বলে মন্তব্য করেন রাহুল। এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতেও লোকসভায় দাঁড়িয়ে রাহুল গান্ধী দাবি করেছিলেন যে ভারত সরকার যুক্তরাষ্ট্রের কাছে জ্বালানি সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দিয়েছে এবং এখন থেকে কোন দেশ থেকে তেল কেনা হবে তা ওয়াশিংটন নির্ধারণ করে দেবে।
রাহুল গান্ধীর এই বিস্ফোরক বক্তব্যের পর বিজেপি ও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া আসা শুরু হয়েছে। এর আগে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এপস্টাইন ফাইলের সাথে প্রধানমন্ত্রীর সংশ্লিষ্টতার দাবিকে একজন অপরাধীর ‘আবর্জনাপূর্ণ জল্পনা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। বিজেপির পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে যে রাহুল গান্ধী বিদেশের মাটিতে বা বিদেশের নাম করে দেশের প্রধানমন্ত্রীকে কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা করছেন যা জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। বিশেষ করে ২০২৬ সালের এই সময়ে যখন বিশ্ব রাজনীতিতে মেরুকরণ চলছে তখন ভারতের প্রধান দুই রাজনৈতিক শিবিরের এমন মুখোমুখি অবস্থান আন্তর্জাতিক মহলেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন রাহুল গান্ধীর এই আক্রমণ মূলত আসন্ন বিভিন্ন রাজ্য নির্বাচনের প্রচারণার অংশ হলেও ‘এপস্টাইন ফাইল’-এর মতো স্পর্শকাতর বিষয় টেনে আনা একটি বড় ধরণের ঝুঁকি। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সাম্প্রতিক শীতল সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে এই ধরণের মন্তব্য দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে অপারেশন সিন্দুর এবং রাশিয়ার তেলের ওপর ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ভারতের অবস্থানের যখন কড়া সমালোচনা হচ্ছে তখন রাহুলের এই দাবি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলল। গুরুগ্রামের এই সমাবেশ থেকে রাহুল গান্ধী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে কংগ্রেস দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এক ইঞ্চিও পিছু হটবে না।
