যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের কৌশলগত প্রতিরক্ষা পর্যালোচনার ওপর ভিত্তি করে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী তাদের স্থল যুদ্ধকৌশলে এক ঐতিহাসিক ও বিপ্লবী পরিবর্তন এনেছে। নতুন এই রণকৌশলটি ‘রেকি-স্ট্রাইক’ ডকট্রিন নামে পরিচিত, যা মূলত স্নায়ুযুদ্ধের পর ব্রিটিশ সামরিক চিন্তাধারার সবচেয়ে বড় রূপান্তর। সমসাময়িক ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোনের ব্যাপক ব্যবহার এবং দ্রুত নিখুঁত হামলার কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করেই এই নতুন সামরিক নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।
ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে প্রচলিত অস্ত্রের চেয়ে প্রযুক্তির ভূমিকাই প্রধান হবে।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, আগামী দিনের যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতির প্রায় ৮০ শতাংশই সম্পন্ন হবে ড্রোন ও স্বায়ত্তশাসিত ব্যবস্থার মাধ্যমে, আর বাকি ২০ শতাংশের জন্য দায়ী থাকবে প্রচলিত সাঁজোয়া যান ও ভারী কামান। ইউক্রেনীয় বাহিনী গোলাবারুদের তীব্র সংকট থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র এই আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে শত্রুপক্ষকে সফলভাবে মোকাবেলা করছে। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে ব্রিটিশ নীতিনির্ধারকরা তাদের বাজেট ও যুদ্ধকৌশল নতুন করে সাজাতে বাধ্য হয়েছেন।
রেকি-স্ট্রাইকের মূল তিনটি স্তম্ভ
সহজ ভাষায় রেকি-স্ট্রাইক হলো এমন একটি ডিজিটাল ইকোসিস্টেম, যা নজরদারি, দূরবর্তী অনুসন্ধান এবং নিখুঁত হামলাকে একটি একক নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে আসে। এর প্রথম স্তম্ভ হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-ভিত্তিক দ্রুত লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ, যা শত্রুর অবস্থান সনাক্ত ও ধ্বংস করার মধ্যবর্তী সময়কে মাত্র কয়েক সেকেন্ডে নামিয়ে আনে। দ্বিতীয় স্তম্ভটি হলো ড্রোন ও সেন্সরের মাধ্যমে যুদ্ধক্ষেত্রে সার্বক্ষণিক গোয়েন্দা নজরদারি বজায় রাখা। এই নজরদারির মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করবে দীর্ঘ দিন ধরে সমালোচিত ‘অজ্যাক্স’ সাঁজোয়া যান, যা এখন রণক্ষেত্রের একটি ডিজিটাল স্নায়ুকেন্দ্রে পরিণত হতে যাচ্ছে।
তৃতীয় স্তম্ভটি হলো দূরপাল্লার নিখুঁত কামান হামলা, যা শত্রুর ফ্রন্টলাইনের অনেক গভীরে আঘাত হানতে সক্ষম। এই লক্ষ্যপূরণে যুক্তরাজ্য সরকার প্রায় ১ বিলিয়ন পাউন্ড চুক্তির অধীনে ৭২টি নতুন স্বয়ংক্রিয় ১৫৫ মিলিমিটার ‘আরসিএইচ ১৫৫’ হাউইটজার কামান ক্রয়ের ঘোষণা দিয়েছে। বক্সার চ্যাসিসের ওপর নির্মিত এই অত্যাধুনিক কামানটি প্রতি মিনিটে আটটি রাউন্ড ফায়ার করতে পারে এবং সর্বোচ্চ ৭০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম। এর পাশাপাশি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যুক্ত হতে যাচ্ছে ‘চ্যালেঞ্জার ৩’ ট্যাংক, যা হবে তাদের ইতিহাসের প্রথম সম্পূর্ণ ডিজিটাল মেইন ব্যাটল ট্যাংক।
কিন্তু এই আধুনিকায়নের পথে সময় একটি বড় বাধা।
ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও আর্থিক বাস্তবতা
বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী এই পুরো ডিজিটাল সামরিক বাহিনীকে পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করতে ২০৩০ সাল পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। বিশ্বজুড়ে চলমান অস্থিরতা এবং সামরিক প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের তুলনায় এই গতি অত্যন্ত ধীর বলে মনে করছেন অভিজ্ঞ সামরিক কর্মকর্তারা। এছাড়া লজিস্টিকস, প্রশিক্ষণ এবং নতুন ডকট্রিনের সাথে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে বিশাল প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এই দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প সফল করতে হলে ব্রিটিশ ট্রেজারি থেকে নিয়মিত অর্থায়ন এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের অটল কৌশলগত মনোযোগ ধরে রাখা অত্যন্ত জরুরি।
লন্ডনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা বা বামপন্থী দলগুলোর সমাজকল্যাণমুখী নীতি অনেক সময় প্রতিরক্ষা বাজেট কমিয়ে দেয়, যা অতীতের ‘শান্তির লভ্যাংশ’ নীতির মতো সামরিক শক্তিকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে তুলতে পারে। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে রাশিয়া, চীন এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলাকে ক্রমাগত হুমকির মুখে ফেলছে। এই পরিস্থিতিতে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে জনকল্যাণের অন্যান্য খাতের আলোচনা সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে পড়বে।
