ইসলামি সমাজব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো পরিবার। একটি শক্তিশালী এবং সুশৃঙ্খল পরিবারই পারে একটি আদর্শ সমাজ উপহার দিতে। মহান আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে একটি একক সত্তা থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়ার বন্ধন স্থাপন করেছেন। ইসলামে পারিবারিক সম্পর্কের গুরুত্ব কেবল সামাজিক প্রয়োজনেই নয় বরং এটি ইবাদতের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে আল্লাহ তাআলা ইবাদতের নির্দেশের পাশাপাশি পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের সাথে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছেন।
পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে পিতা-মাতার অধিকারের ওপর। মহান আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন: ﴿وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُশْرِكُوا بِهِ شَيْئًا ۖ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا﴾ বাংলায় আরবি উচ্চারণ: "ওয়া’বুদুল্লা-হা ওয়ালা তুশরিকূ বিহি শাইআঁও ওয়াবিল ওয়ালিদাইনি ইহসানা।" অর্থ: "আর তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক করো না। আর পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার কর।" (সূরা আন-নিসা, ৪:৩৬) এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা নিজের তাওহীদের বর্ণনার পরেই পিতা-মাতার প্রতি ইহসান বা সুন্দর আচরণের নির্দেশ দিয়েছেন যা থেকে তাদের উচ্চ মর্যাদা স্পষ্ট হয়।
সন্তান ও পিতা-মাতার মধ্যকার সম্পর্কের পর আসে স্বামী-স্ত্রীর পবিত্র বন্ধন। ইসলাম এই সম্পর্ককে প্রশান্তি ও ভালোবাসার আধার হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে। একজন আদর্শ মুসলিম হিসেবে পরিবারের সদস্যদের সাথে সবচেয়ে ভালো আচরণ করা জরুরি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ প্রসঙ্গে অত্যন্ত স্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেছেন। সহীহ তিরমিজিতে বর্ণিত হয়েছে যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম যে তার পরিবারের নিকট উত্তম আর আমি আমার পরিবারের নিকট তোমাদের চেয়েও বেশি উত্তম। এই হাদিসটি প্রতিটি মুসলিম পুরুষের জন্য একটি মানদণ্ড হিসেবে কাজ করে যেখানে ঘরের বাইরের আচরণের চেয়ে ঘরের ভেতরের সদস্যদের সাথে কোমল ও ন্যায়পরায়ণ আচরণকে শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি ধরা হয়েছে।
পারিবারিক সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখা যাকে শরিয়তের পরিভাষায় সিলাতুল রাহিম বলা হয়। আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা ইসলামে একটি কবীরা গুনাহ এবং এটি জান্নাতে প্রবেশের পথে অন্তরায় হতে পারে। সহীহ বুখারীতে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যে ব্যক্তি চায় যে তার রিযিক প্রশস্ত হোক এবং তার আয়ু বৃদ্ধি পাক সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে। এই শিক্ষা আমাদের শেখায় যে পারিবারিক বন্ধন অটুট রাখা কেবল পরকালীন মুক্তিই নয় বরং দুনিয়াবী বরকত ও সমৃদ্ধিরও চাবিকাঠি। আধুনিক যুগে আমরা যখন ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনের দিকে ঝুঁকে পড়ছি তখন ইসলামের এই কালজয়ী নির্দেশনা আমাদের সামাজিক নিরাপত্তা ও মানসিক প্রশান্তি নিশ্চিত করতে পারে।
সন্তানদের সঠিক লালন-পালন এবং তাদের দ্বীনি শিক্ষায় শিক্ষিত করাও পারিবারিক সম্পর্কের একটি বড় হক বা অধিকার। মা-বাবাকে তাদের সন্তানদের প্রতি যত্নশীল হতে হবে যাতে তারা ভবিষ্যতে সমাজের জন্য কল্যাণকর মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। সন্তানদের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শনের পাশাপাশি তাদের শৃঙ্খলা ও নৈতিকতা শেখানো ইসলামের শিক্ষা। অন্যদিকে সন্তানদের উচিত পিতা-মাতা বৃদ্ধ হলে তাদের প্রতি সর্বোচ্চ মমতা প্রদর্শন করা। আল্লাহ তাআলা আল-কুরআনে শিখিয়ে দিয়েছেন যেন আমরা পিতা-মাতার বার্ধক্যে তাদের উফ শব্দটিও না বলি এবং তাদের সামনে বিনয়ের ডানা বিছিয়ে দেই।
ইসলামে পরিবার শুধু রক্তের সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং এটি একটি নৈতিক ও আধ্যাত্মিক সংযোগ। যখন একটি পরিবারের প্রতিটি সদস্য নিজের অধিকারের চেয়ে অন্যের হকের ব্যাপারে বেশি সচেতন থাকে তখনই সেই ঘর জান্নাতের বাগানে পরিণত হয়। আত্মীয়স্বজনের খোঁজখবর নেওয়া তাদের বিপদে পাশে দাঁড়ানো এবং সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করা ঈমানের পূর্ণতার বহিঃপ্রকাশ। যারা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে তাদের ব্যাপারে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারিত হয়েছে। সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে যে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না। সুতরাং একজন মুমিনের কর্তব্য হলো নিজের রাগ ক্ষোভ বা তুচ্ছ স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে পারিবারিক ঐক্য বজায় রাখা।
পরিশেষে বলা যায় যে একটি সুন্দর পারিবারিক জীবনই দুনিয়া ও আখেরাতের সফলতার সোপান। মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সুন্নাহর আলোকে নিজেদের পরিবার পরিচালনা করার এবং আত্মীয়তার বন্ধনকে দৃঢ় করার তৌফিক দান করুন। পারিবারিক প্রতিটি সদস্যের প্রতি সদয় হওয়া এবং সহনশীলতা প্রদর্শন করার মাধ্যমে আমরা একটি উন্নত সমাজ বিনির্মাণ করতে পারি যা মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে সহায়ক হবে।

আপনার মতামত লিখুন :