ইসলামি সমাজব্যবস্থার মূল একক এবং আত্মিক প্রশান্তির প্রধান কেন্দ্র হলো পরিবার। এটি কেবল একটি সামাজিক কাঠামো বা রক্তের সম্পর্কের সমষ্টি নয় বরং মহান আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এক বিশেষ নেয়ামত ও জান্নাতের পৃথিবীর রূপ। একটি আদর্শ পরিবারে ভালোবাসা ত্যাগ এবং ভরসার সম্মিলন ঘটে যা ব্যক্তিকে একটি সুশৃঙ্খল ও নৈতিক জীবন যাপনে উদ্বুদ্ধ করে। বর্তমান ব্যস্ত পৃথিবীতে মানুষ যখন বস্তুগত অর্জনের পেছনে ছুটছে তখন পরিবারের গুরুত্ব পুনর্মূল্যায়ন করা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে যে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো এই পরিবার যার মাধ্যমেই একজন মুমিন তার চরিত্র গঠন করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে এগিয়ে যায়।
পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা ও পরকালীন মুক্তি নিশ্চিত করা প্রতিটি ঈমানদারের জন্য একটি অপরিহার্য কর্তব্য। মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে মুমিনদের প্রতি এই বিশেষ নির্দেশ প্রদান করেছেন যাতে তারা কেবল নিজেদের নয় বরং তাদের অধীনস্থদেরও বিপথগামিতা থেকে রক্ষা করে। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে: ﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنফُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا﴾ বাংলায় আরবি উচ্চারণ: "ইয়া- আইয়্যুহাল্লাযীনা আ-মানূ কূ আনফুসাকুম ওয়া আহলীকুম না-রা-।" অর্থ: "হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা কর আগুন থেকে।" (সূরা আত-তাহরীম, ৬৬:৬) এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে পরিবারের সদস্যদের সঠিক দ্বীনি শিক্ষা প্রদান এবং তাদের আখলাক সংশোধন করা কেবল দুনিয়াবী দায়িত্ব নয় বরং এটি আখেরাতের জবাবদিহিতার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত।
পরিবারের শান্তি ও স্থায়িত্ব নির্ভর করে সদস্যদের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও দায়িত্বশীল আচরণের ওপর। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কালজয়ী নির্দেশনা দিয়ে গেছেন যা প্রতিটি মুসলিমের জন্য আদর্শ। সুনানে তিরমিযিতে বর্ণিত একটি সহীহ হাদিসে তিনি উল্লেখ করেছেন যে তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম যে তার পরিবারের নিকট উত্তম আর আমি আমার পরিবারের নিকট তোমাদের চেয়েও বেশি উত্তম। এই হাদিসটি স্পষ্ট করে দেয় যে একজন মানুষের প্রকৃত আভিজাত্য এবং চারিত্রিক উৎকর্ষ তার ঘরের বাইরের জনপ্রিয়তায় নয় বরং ঘরের ভেতরে আপনজনদের সাথে আচরণের মাধ্যমে বিচার করা হয়। একজন মুমিন তার পরিবারের নিকট নম্র সহনশীল এবং ক্ষমাশীল হওয়ার মাধ্যমেই পূর্ণতা লাভ করে।
সুখী পরিবার গঠনে পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণ এবং হালাল রিজিকের সংস্থানের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইসলামি বিধানে পরিবারের জন্য হালাল উপার্জনের চেষ্টা করাকে কেবল জাগতিক কাজ হিসেবে দেখা হয় না বরং এটি ইবাদতের মর্যাদা রাখে। সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে যে পরিবারের জন্য হালাল রিজিকের সন্ধান করা ইবাদতের সমতুল্য। একইভাবে সহীহ বুখারী ও মুসলিমের অপর একটি বর্ণনায় এসেছে যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তার পরিবারের জন্য ব্যয় করে সেটি তার আমলনামায় সদকা হিসেবে গণ্য হয়। এই শিক্ষা আমাদের উদ্বুদ্ধ করে যেন আমরা পরিবারের জন্য কঠোর পরিশ্রম করি এবং তাদের মুখে হাসি ফোটানোর মাধ্যমে মহান আল্লাহর রহমত লাভের প্রত্যাশা করি।
পারিবারিক সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার পবিত্র বন্ধন। ইসলাম স্ত্রীকে আল্লাহর আমানত হিসেবে বর্ণনা করেছে এবং তাদের প্রতি সদাচারের নির্দেশ দিয়েছে। সহীহ মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী স্ত্রীদের প্রতি সদয় হওয়া ঈমানের অন্যতম দাবি। তারা কেবল গৃহিণী নন বরং পরিবারের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও প্রশান্তির প্রধান উৎস। ঠিক একইভাবে সন্তানদের প্রতি সদয় হওয়া এবং তাদের উত্তম আদব ও শিক্ষা প্রদান করা মা-বাবার মৌলিক দায়িত্ব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিশুদের স্নেহ করতে এবং তাদের সাথে কোমল আচরণ করতে বারবার তাগিদ দিয়েছেন কারণ আজকের শিশুরাই আগামী দিনের আদর্শ পরিবারের কারিগর।
পরিবার হচ্ছে সেই প্রথম পাঠশালা যেখানে ধৈর্য ও আত্মত্যাগের বাস্তব অনুশীলন হয়। একটি সুখী ও আদর্শ ঘর তখনই গড়ে ওঠে যখন সেখানে ‘আমি’র পরিবর্তে ‘আমরা’ প্রাধান্য পায়। টাকা বা বৈষয়িক সম্পদ দিয়ে ঘর সাজানো গেলেও শান্তি ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন হয় পারস্পরিক বোঝাপড়া ও ক্ষমা। বর্তমান যুগে অনেক পরিবারে বিশৃঙ্খলা দেখা দেওয়ার মূল কারণ হলো আধুনিকতার নামে দায়িত্বহীনতা এবং ধৈর্যহীনতা। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে যে ভুলত্রুটি থাকা সত্ত্বেও পরিবারের সদস্যদের পাশে দাঁড়ানোই হলো প্রকৃত বীরত্ব। রক্তের সম্পর্ক যেমন জন্মের সাথে সাথে তৈরি হয় তেমনি দায়িত্ব ও ভালোবাসা দিয়ে সেই সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখা প্রতিটি পরিবারের সদস্যের কর্তব্য।
পরিশেষে বলা যায় যে পরিবার হলো জান্নাতের একটি প্রতিচ্ছবি যেখানে ভালোবাসা ও সহমর্মিতা বিরাজ করে। একটি আদর্শ পরিবার কেবল দুনিয়াতে মানসিক শান্তির আধার নয় বরং আখেরাতেও এটি উচ্চ মর্যাদার মাধ্যম। মহান আল্লাহর দেওয়া এই নেয়ামতের গুরুত্ব উপলব্ধি করে আমাদের উচিত পরিবারের প্রতিটি সদস্যের অধিকার আদায়ে সচেষ্ট হওয়া। পরিবারকে সময় দেওয়া তাদের কথা শোনা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের ভিত্তিতে ঘর পরিচালনা করাই হলো প্রকৃত সাফল্যের চাবিকাঠি। মহান আল্লাহ আমাদের প্রতিটি পরিবারকে রহমত বরকত ও দ্বীনি নূর দ্বারা আলোকিত করুন এবং আমাদের ঘরগুলোকে একেকটি শান্তির জান্নাত হিসেবে কবুল করুন। আমিন।

আপনার মতামত লিখুন :