শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১৫ ফাল্গুন ১৪৩২

রোজার পূর্ণ সওয়াব অর্জনের উপায় ও জরুরি আদবসমূহ

উম্মাহ কণ্ঠ ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২৬, ১২:৪৪ পিএম
রোজার পূর্ণ সওয়াব অর্জনের উপায় ও জরুরি আদবসমূহ

রোজার আধ্যাত্মিকতা ও শিষ্টাচার | ছবি Ai

ইসলামি জীবনদর্শনে ইবাদতের বাহ্যিক কাঠামোর চেয়ে তার অভ্যন্তরীণ রুহ বা আধ্যাত্মিক প্রাণশক্তিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সিয়াম বা রোজা কেবল সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও কামাচার বর্জন করার নাম নয়, বরং এটি একটি সামগ্রিক আত্মিক সাধনা। আরবিতে ‘আদব’ শব্দের অর্থ হলো শিষ্টাচার, সৌজন্য বা উৎকৃষ্ট পদ্ধতি। একজন মুমিনের জন্য রোজার প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর সন্তুষ্টির উপযোগী করে গড়ে তোলাই হলো রোজার আদব। যখন একজন মুসলিম তার প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে, তখনই তার মাঝে তাকওয়ার নূর প্রস্ফুটিত হয়। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে রোজার মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে ঘোষণা করেছেন: ﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كুতِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ﴾ বাংলায় আরবি উচ্চারণ: "ইয়া আইয়্যুহাল্লাযীনা আমানূ কুতিবা আলাইকুমুস্ব-স্বিয়া-মু কামা কুতিবা ‘আলাল্লাযীনা মিন ক্বাবলিকুম লা‘আল্লাকুম তাত্তাক্বূন।" অর্থ: "হে মুমিনগণ, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।" (সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৩) এই আয়াতের দাবি পূরণ করতে হলে রোজাদারকে অবশ্যই তার আচার-আচরণ ও চরিত্রে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে।

রোজার আদবসমূহের মধ্যে সর্বাগ্রে আসে নিয়তের বিশুদ্ধতা। কোনো লৌকিকতা বা মানুষের প্রশংসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা নয়, বরং কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ক্ষুধার কষ্ট সহ্য করাই সিয়ামের প্রথম শর্ত। এর পরবর্তী ধাপ হলো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের রোজা। মানুষ যখন খাবার ত্যাগ করে তখন তার পাকস্থলী রোজা রাখে, কিন্তু প্রকৃত মুমিনের চোখেরও রোজা থাকে, কানেরও রোজা থাকে এবং জবানেরও রোজা থাকে। দৃষ্টির হেফাজত করা রোজার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আদব। হারুন বা নিষিদ্ধ কোনো বস্তুর দিকে নজর দেওয়া রোজার নূরকে নিভিয়ে দেয়। একইভাবে কানের রোজা হলো পরনিন্দা, গীবত, গান-বাদ্য বা অনর্থক কথাবার্তা শোনা থেকে কানকে বাঁচিয়ে রাখা। রোজাদার যখন কোনো মজলিসে বসে যেখানে গীবত হচ্ছে, তখন সেখান থেকে সরে আসাই হলো আদবের দাবি।

রোজার পূর্ণাঙ্গ সওয়াব অর্জনের ক্ষেত্রে জিহবা বা জবানের হেফাজত করাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহ অনুসারে রোজা অবস্থায় মিথ্যা বলা, গীবত করা, ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হওয়া এবং অশ্লীল বাক্য উচ্চারণ করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। সহীহ বুখারীর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হাদীসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন যে ব্যক্তি রোজা রেখে মিথ্যা কথা ও মন্দ কাজ ত্যাগ করতে পারল না, তার কেবল পানাহার ত্যাগের কোনো প্রয়োজন আল্লাহর নেই। এই হাদীসটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, রোজার মূল উদ্দেশ্য হলো চরিত্রের পরিশোধন। যদি কারো আচরণে পরিবর্তন না আসে, তবে তার ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করা কেবল একটি অর্থহীন উপবাসে পরিণত হয়।

সামাজিক জীবনে রোজার আদব বজায় রাখা ধৈর্যের একটি বড় পরীক্ষা। অনেক সময় রোজা রাখা অবস্থায় ক্ষুধার চাপে বা ক্লান্তিজনিত কারণে মানুষ দ্রুত রাগান্বিত হয়ে পড়ে। ইসলামি শিক্ষা অনুযায়ী, এই সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং শান্ত থাকাই হলো সিয়ামের শিক্ষা। যদি কেউ উপযাচক হয়ে ঝগড়া করতে আসে বা গালি দেয়, তবে তার প্রতিউত্তর না দিয়ে মনে মনে বা মুখে ‘আমি রোজাদার’ এ কথা বলা সুন্নত। এর মাধ্যমে নিজের নফসকে দমন করা সহজ হয় এবং পরিবেশের শান্তি বজায় থাকে। এটি কেবল একটি বাক্য নয়, বরং এটি একটি আত্মিক ঢাল যা মুমিনকে শয়তানের প্ররোচনা থেকে রক্ষা করে।

রোজার সওয়াবকে বহুগুণ বৃদ্ধি করার জন্য ইবাদতে মনোনিবেশ করা জরুরি। রোজার আদব হলো দিনের অধিকাংশ সময় যিকির, তিলাওয়াতে কুরআন এবং নফল ইবাদতের মাধ্যমে নিজেকে ব্যস্ত রাখা। রমজান হলো কুরআনের মাস, তাই এই মাসে বেশি বেশি কুরআন অধ্যয়ন ও তার মর্ম উপলব্ধি করা রোজার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তদুপরি, দান-সদকার মাধ্যমে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো রোজার একটি অন্যতম সামাজিক আদব। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজান মাসে বাতাসের চেয়েও বেশি দানশীল হয়ে যেতেন। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ইফতার করানো এবং অভাবগ্রস্তদের প্রয়োজন পূরণ করার মাধ্যমে রোজার সওয়াব পরিপূর্ণতা পায়।

সেহরি ও ইফতারের ক্ষেত্রেও বিশেষ আদব বর্ণিত হয়েছে। সেহরি খাওয়া সুন্নত এবং এতে বরকত রয়েছে। অনেক সময় অলসতা করে সেহরি না খেয়ে রোজা রাখার প্রবণতা দেখা যায়, যা সুন্নাহ পরিপন্থী। একইভাবে সময় হওয়ার সাথে সাথে ইফতার করা এবং ইফতারের সময় অতিরিক্ত অপচয় না করা রোজার আদবের অন্তর্ভুক্ত। পরিমিত আহার মুমিনকে ইবাদতে উদ্যমী করে তোলে, পক্ষান্তরে অতিভোজন ইবাদতে অলসতা সৃষ্টি করে। রোজার সওয়াব কামাই করার জন্য প্রতিটি কাজ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর শেখানো পদ্ধতিতে সম্পন্ন করা একান্ত কর্তব্য।

হাতের এবং পায়ের পবিত্রতা রক্ষা করাও রোজার আদবের অংশ। এমন কোনো জায়গায় না যাওয়া যেখানে আল্লাহ ও তার রাসুলের অবাধ্যতা হয় এবং এমন কোনো কাজ হাতে না নেওয়া যা অন্যের কষ্টের কারণ হয়। রোজার মাধ্যমে মানুষের ভেতরে বিনয় ও নম্রতা তৈরি হওয়া উচিত। শোরগোল, হট্টগোল বা অহংকার প্রদর্শন থেকে বিরত থাকাই হলো পরহেযগারীর লক্ষণ। মুমিন যখন তার প্রতিটি অঙ্গকে আল্লাহর ভয়ে গুনাহ থেকে দূরে রাখে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজেকে উৎসর্গ করে, তখনই তার রোজা আরশের অধিপতির কাছে কবুল হওয়ার যোগ্য হয়। ধৈর্য ও সহনশীলতার সাথে রমজানের প্রতিটি দিন অতিবাহিত করাই হোক আমাদের লক্ষ্য, যেন আমরা প্রকৃত তাকওয়া অর্জন করে সফলকাম হতে পারি।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

ফিকহ বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!