শেরেবাংলা নগরের জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে তখন সন্ধ্যার আবছা আলো। চারদিকে নতুন সরকারের শপথ গ্রহণের প্রস্তুতি আর রাজপথে চাপা উত্তেজনা। যদিও এই নির্বাচনে বিএনপি ২১২টি আসন পেয়ে বড় জয় নিশ্চিত করেছে, কিন্তু পর্দার অন্তরালে সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে জামায়াতে ইসলামী। দীর্ঘ সময় রাজপথের কোণঠাসা অবস্থান কাটিয়ে দলটি এবার সংসদে ৬৮টি আসন লাভ করেছে, যা কেবল একটি নির্বাচনী জয় নয় বরং দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে এক বিশাল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই উত্থানকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করছে। ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ান থেকে শুরু করে রয়টার্স—সবার বিশ্লেষণেই উঠে আসছে যে জামায়াত এখন আর কেবল একটি ধর্মভিত্তিক দল নয়, বরং তারা নিজেদের এক আধুনিক ও মডারেট সংস্করণে রূপান্তর করছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা জামায়াতের বর্তমান এই কৌশলকে ২০০২ সালে তুরস্কের এরদোয়ানের নেতৃত্বাধীন একে পার্টির উত্থানের সাথে তুলনা করছেন। একে পার্টি যেভাবে শরিয়ত নয় বরং উন্নয়ন, সুশাসন এবং স্থিতিশীলতার স্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল, জামায়াতও এখন ঠিক সেই ভাষাতেই কথা বলছে। তারা প্রগতিশীল ইসলাম, দুর্নীতি দমন এবং ন্যাবিচারের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে যা সাধারণ ভোটারদের কাছে ভয়ের বদলে সুশাসনের আশা জাগাচ্ছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে রাজপথে তাদের সুশৃঙ্খল অবস্থান এবং পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বিপুল জয় তাদের সাংগঠনিক সক্ষমতার জানান দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি যদি সরকার পরিচালনায় ব্যর্থ হয় বা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে, তবে দেশের মানুষ খুব সহজেই জামায়াতকে পরবর্তী বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করতে পারে।
তবে জামায়াতের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে নারী ভোটারদের মন জয় করা। বাংলাদেশের অর্ধেক ভোটারই নারী এবং ঐতিহাসিকভাবে জামায়াতের ব্যাপারে নারী সমাজের মধ্যে এক ধরনের সংশয় বা ভীতি কাজ করে। এছাড়া ১৯৭১ সালের রাজনৈতিক অবস্থানের বোঝা দলটিকে আজও বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, জামায়াত যদি ক্ষমতায় যেতে চায় তবে তাদের এমন সব সাহসী ও প্রগতিশীল পদক্ষেপ নিতে হবে যাতে নারী সমাজ নিজেদের নিরাপদ বোধ করে। দলটির তৃণমূল নেটওয়ার্ক এবং সীমান্ত সংলগ্ন আসনগুলোতে তাদের বিজয় দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতেও নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। শেষ পর্যন্ত শীতের এই কুয়াশাচ্ছন্ন সন্ধ্যায় প্রশ্নটি এখনো ঝুলে আছে—ভবিষ্যতের সিংহাসনে কার পায়ের ছাপ পড়বে?

আপনার মতামত লিখুন :