আকাশের বুক চিরে যখন কালো মেঘের ঘনঘটা নেমে আসে আর এই ধরণী যখন জুলুমের ভারে নুয়ে পড়ে, তখন মুমিন হৃদয়ে এক করুণ আর্তি প্রতিধ্বনিত হয়—আমরা আজ কোন অন্ধকার সময়ের কিনারে দাঁড়িয়ে আছি? পৃথিবীর প্রতিটি ধূলিকণা যেন আজ এক মহান পরিত্রাতার জন্য হাহাকার করছে। আজ যখন চারদিকে তেলের মূল্যবৃদ্ধি আর অর্থনৈতিক সংকটের হাহাকার বাজে, যখন ঘরে ঘরে অভাবের আগুন জ্বলে ওঠে, তখন মনে মনে প্রশ্ন জাগে—আল্লাহর সেই ওয়াদা করা সাহায্য কি তবে খুব কাছেই? মহান খলীফা ইমাম মাহদী কি তবে আমাদের এই অন্ধকার প্রহরে আলোর মশাল নিয়ে আবির্ভূত হতে চলেছেন?
জ্বালানি সংকট ও তেলের রাজনীতি: হাদীসের সেই সতর্কবার্তা আজকের পৃথিবীতে তেল কেবল একটি দাহ্য পদার্থ নয়, বরং এটি বিশ্ব অর্থনীতির `প্রাণভোমরা`। আর যখন এই প্রাণের ওপর আঘাত আসে, তখন পুরো সভ্যতা থমকে যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ১৪০০ বছর আগেই এই ধরনের বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। সহীহ মুসলিমের একটি প্রামাণ্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, আখেরী যামানায় ইরাক এবং শামের ওপর এমন এক অবরোধ (Sanction) আরোপ করা হবে যে, সেখানে কোনো দিরহাম বা খাদ্যশস্য পৌঁছাতে দেওয়া হবে না। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেছেন, "ইরাক তার দিরহাম ও কাফীজ থেকে বঞ্চিত হবে, শাম তার দিনার ও মুদ থেকে বঞ্চিত হবে এবং মিশর তার দিনার ও ইরদাব থেকে বঞ্চিত হবে" (সহীহ মুসলিম, ২৮৯৬)। বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে যেভাবে রাষ্ট্রগুলোকে কোণঠাসা করা হচ্ছে, তা এই হাদীসের এক জলজ্যান্ত বাস্তব প্রতিচ্ছবি।
ফোরাত নদী ও `কালো সোনা`র উন্মোচন ইমাম মাহদীর আগমনের পটভূমি তৈরিতে প্রাকৃতিক সম্পদের এক বিশাল ভূমিকা থাকবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করেছিলেন যে, ফোরাত নদী অচিরেই তার ভেতর থেকে স্বর্ণের পাহাড় উন্মোচন করবে এবং তা নিয়ে এমন যুদ্ধ হবে যেখানে প্রতি ১০০ জনের মধ্যে ৯৯ জনই মারা যাবে (সহীহ মুসলিম, ২৮৯৪)। সমসাময়িক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই `স্বর্ণ` হতে পারে খনিজ তেল বা আধুনিক কোনো মূল্যবান সম্পদ যা দখল করতে গিয়ে পৃথিবী আজ এক ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে। তেলের জন্য এই রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম মূলত সেই মহাপ্রলয়েরই পূর্বাভাস।
দাজ্জালি অর্থনীতি ও প্রতারণার বছর বর্তমানে বিশ্বজুড়ে যে মুদ্রাস্ফীতি এবং ডলারের অস্থিরতা চলছে, তা মূলত একটি `প্রতারণামূলক ব্যবস্থার` অংশ। নবীজি (সা.) বলেছেন, দাজ্জালের আসার আগে কিছু প্রতারণার বছর আসবে যখন সত্যবাদীকে মিথ্যাবাদী বলা হবে আর মিথ্যাবাদীকে সত্যবাদী বলা হবে (সুনানে ইবনে মাজাহ, ৪০৩৬)। আজকের কৃত্রিম সংকট আর ডিজিটাল অর্থনীতির ধোঁকাবাজি কি সেই ফিতনারই অংশ নয়? এই অস্থিরতার মাঝেই ইমাম মাহদীর আবির্ভাব ঘটবে, যিনি এই পৃথিবীকে ইনসাফ এবং প্রাচুর্য দিয়ে পূর্ণ করে দেবেন। তিনি গণনা ছাড়াই মানুষের মাঝে সম্পদ বিতরণ করবেন (সহীহ মুসলিম, ২৯১৩)।
উপসংহার: মুমিনের পাথেয় অর্থনৈতিক হাহাকার তো আসলে আমাদের আমলেরই প্রতিফল। আমরা সুদের কারবারে মত্ত হয়ে আল্লাহর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছি। আজ তেলের সংকট দিয়ে হয়তো আল্লাহ আমাদের পরীক্ষা করছেন যেন আমরা তাঁর দিকে ফিরে আসি। ইমাম মাহদীর সাথী হবে তারাই, যারা অভাবের দিনেও আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল (ভরসা) করেছে। তেলের দাম বাড়ুক বা কমুক, আমাদের রিযিকের মালিক আল্লাহ—এই বিশ্বাসের ওপর অটল থাকাই এই ফিতনার যুগের একমাত্র মুক্তি।

আপনার মতামত লিখুন :