মানুষের যাপিত জীবনের প্রতিটি স্পন্দন এবং মহাবিশ্বের প্রতিটি কণার আবর্তন এক পরম সত্তার ইশারায় পরিচালিত হচ্ছে। আমাদের এই নশ্বর পৃথিবীতে আমরা প্রায়ই সম্পদের মোহে মত্ত হয়ে পড়ি এবং ভুলে যাই যে আমরা যা কিছু অর্জন করছি, তার প্রকৃত মালিক আমরা নই। আমরা কেবল মহান রবের দেওয়া আমানতের পাহারাদার মাত্র। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে এই সম্পদকে অপবিত্রতা থেকে মুক্ত করতে হয়। যাকাত কেবল একটি আর্থিক বাধ্যবাধকতা বা ট্যাক্স নয়, বরং এটি আমাদের নাফস বা আত্মাকে কৃপণতার কালিমা থেকে পরিশুদ্ধ করার এক অলৌকিক ঐশী পদ্ধতি।
যাকাত কেন জরুরি? আধ্যাত্মিক ও সামাজিক দর্শন
মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে সালাতের পাশাপাশি যাকাতের নির্দেশ দিয়ে স্পষ্ট করেছেন যে, রবের সামনে সিজদাহ করার পর তাঁর অভাবী বান্দাদের প্রতি দায়িত্ব পালন না করলে সেই ইবাদত পূর্ণতা পায় না (সূরা আল-বাকারা, ২:১১০)। যাকাত শব্দের অর্থই হলো বৃদ্ধি পাওয়া এবং পবিত্র হওয়া। এটি ধনী ও দরিদ্রের মাঝে এক সেতুবন্ধন তৈরি করে এবং সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করে। যারা সম্পদ কুক্ষিগত করে রাখে, তাদের জন্য আল্লাহ কঠিন হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, কিয়ামতের দিন সেই সম্পদ উত্তপ্ত করে তাদের শরীরে দাগ দেওয়া হবে (সূরা আত-তাওবা, ৯:৩৪)।
সঠিক নিয়মে যাকাত হিসাব করার পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন
যাকাত ফরয হওয়ার জন্য সম্পদের একটি নির্দিষ্ট সীমারেখা বা `নিসাব` রয়েছে। আপনার কাছে যদি আপনার মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদ পূর্ণ এক চন্দ্রবছর জমা থাকে, তবে তার ওপর যাকাত ফরয হয়।
১. নিসাব নির্ধারণ: * স্বর্ণ: সাড়ে সাত তোলা বা ৮৭.৪৮ গ্রাম।
রৌপ্য: সাড়ে বায়ান্ন তোলা বা ৬১২.৩৬ গ্রাম।
নগদ অর্থ বা ব্যবসায়িক পণ্য: বর্তমান বাজার অনুযায়ী রৌপ্যের দামকে স্ট্যান্ডার্ড ধরে (সাধারণত সত্তর থেকে পঁচাত্তর হাজার টাকা) যদি সমপরিমাণ অর্থ এক বছর আপনার কাছে অলস পড়ে থাকে, তবেই যাকাত দিতে হবে।
২. হিসাবের সূত্র ($2.5\%$):
যাকাতযোগ্য মোট সম্পদ থেকে আপনার জরুরি ব্যক্তিগত ঋণ বাদ দেওয়ার পর অবশিষ্ট অর্থের ওপর আড়াই শতাংশ ($2.5\%$) যাকাত আদায় করতে হবে।
গাণিতিক উদাহরণ: যদি আপনার ১০ লক্ষ টাকা থাকে এবং ২ লক্ষ টাকা ঋণ থাকে, তবে নিট ৮ লক্ষ টাকার ওপর যাকাত হবে ২০,০০০ টাকা।
৩. সৌর বনাম চান্দ্র বছর:
যাকাতের হিসাব হিজরি বা চান্দ্র ক্যালেন্ডার অনুযায়ী করা সুন্নাহ। যদি কেউ সৌর বছর (৩৬৫ দিন) অনুযায়ী হিসাব করেন, তবে তাকে প্রায় $2.58\%$ হারে যাকাত দিতে হবে কারণ সৌর বছর চান্দ্র বছরের চেয়ে দীর্ঘ হয়।
যাকাতের আটটি হকদার খাত (সূরা আত-তাওবা, ৯:৬০)
আল্লাহ তায়ালা যাকাত বন্টনের জন্য আটটি সুনির্দিষ্ট খাত নির্ধারণ করেছেন:
১. ফকির (যাদের কিছুই নেই)
২. মিসকিন (যাদের সঞ্চয় নেই)
৩. যাকাত আদায়ে নিয়োজিত কর্মচারী
৪. নওমুসলিম বা ইসলামের প্রতি অনুরাগী ব্যক্তি
৫. দাস মুক্তি বা বন্দি মুক্তি
৬. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি (যিনি ঋণ পরিশোধে অক্ষম)
৭. ফি-সাবিলিল্লাহ (আল্লাহর পথে সংগ্রাম বা দ্বীনি শিক্ষা)
৮. মুসাফির (সফরে বিপদে পড়া ব্যক্তি)
উপসংহার ও আমল কবুলের আকুতি
যাকাত আদায় করার সময় নিয়ত হতে হবে খালেস। লোকদেখানো দান আমলকে নষ্ট করে দেয়। আজ যখন ফিলিস্তিন থেকে শুরু করে বিশ্বের আনাচে-কানাচে মুসলমানরা মজলুম অবস্থায় আছে, আমাদের যাকাতের প্রতিটি পয়সা তাদের মুখে হাসি ফোটানোর উসিলা হতে পারে। হে আরশের মালিক, আপনি আমাদের অন্তর থেকে কৃপণতা দূর করে দিন এবং আমাদের সম্পদকে কবুল করুন।

আপনার মতামত লিখুন :