মানুষের যাপিত জীবনের প্রতিটি স্পন্দন যখন জুলুম আর অবিচারের ভারে নুয়ে পড়ে, তখন মুমিন হৃদয়ে এক পরম পরিত্রাতার আকাঙ্ক্ষা জেগে ওঠে। আখেরী যামানার এই কঠিন সন্ধিক্ষণে ইমাম মাহদী (আলাইহিস সালাম)-এর আগমনের খবর আমাদের মনে আশার আলো জ্বালায়। তবে এই সুযোগে একদল ধূর্ত ভণ্ড ও মিথ্যাবাদী নিজেদেরকে `মাহদী` দাবি করে সরলমনা মুসলমানদের ঈমান নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। ইউটিউব, ফেসবুক আর সোশ্যাল মিডিয়ার পাতায় প্রতিদিন নতুন নতুন মাহদীর আবির্ভাব ঘটছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ভণ্ডদের এই ভিড়ে আমরা আসল ইমাম মাহদীকে চিনব কীভাবে?
ইমাম মাহদীর পরিচয় কোনো ফেসবুক পোস্ট বা ভাইরাল ভিডিওর মাধ্যমে আসবে না। রাসূলুল্লাহ ﷺ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তাঁর নাম ও বংশ বলে গেছেন। হাদীস অনুযায়ী:
নাম: তাঁর নাম হবে নবীজির নামের মতো (মুহাম্মাদ) এবং তাঁর পিতার নাম হবে নবীজির পিতার নামের মতো (আব্দুল্লাহ)। অর্থাৎ তাঁর পুরো নাম হবে মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ (সুনানে আবু দাউদ, ৪২৮৪)।
বংশ: তিনি হবেন নবীদুহিতা সাইয়্যেদাহ ফাতেমা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর বংশধর এবং হযরত হাসান (রা.)-এর বংশধারা থেকে (সুনানে আবু দাউদ, ৪২৮২)। বর্তমানে যারা ভিন্ন নাম বা ভিন্ন বংশীয় পরিচয়ে নিজেদের মাহদী দাবি করছে, তারা স্পষ্টতই কাজ্জাব বা মিথ্যাবাদী।
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইমাম মাহদীর শারীরিক গঠন সম্পর্কেও অকাট্য বর্ণনা দিয়ে গেছেন। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, ইমাম মাহদীর কপাল হবে প্রশস্ত এবং তাঁর নাক হবে উন্নত ও খাড়া (সুনানে আবু দাউদ, ৪২৮৫)। এই শারীরিক চিহ্নগুলো কোনো ভণ্ড নিজের মাঝে কৃত্রিমভাবে তৈরি করতে পারবে না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইমাম মাহদী কখনো নিজে থেকে "আমিই মাহদী" বলে প্রচারণা চালাবেন না। বরং তিনি মদিনা থেকে মক্কায় পালিয়ে আসবেন এই গুরুদায়িত্ব এড়ানোর জন্য। কাবার রুকন এবং মাকামে ইব্রাহীমের মাঝখানে একদল নিষ্ঠাবান মুমিন তাঁকে চিনে ফেলবেন এবং তাঁকে বাধ্য করে বাইয়াত গ্রহণ করাবেন। সেই মুহূর্তে তাঁর চোখে থাকবে অশ্রু, কারণ তিনি ক্ষমতার লোভী নন (আল-ফিতান, নুয়াইম ইবনে হাম্মাদ)।
ইমাম মাহদীর আগমনের সময় আসমান থেকে একটি গায়েবি আওয়াজ আসবে, যা পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ নিজ নিজ ভাষায় শুনতে পাবে। সেই অকাট্য প্রমাণের আগে কোনো মানুষের ব্যক্তিগত দাবি গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর শাসনামলে পৃথিবী ইনসাফ ও ন্যায়বিচারে ভরে যাবে। সম্পদের এত প্রাচুর্য হবে যে, মানুষ যাকাত দেওয়ার জন্য গ্রহীতা খুঁজে পাবে না (সুনানে ইবনে মাজাহ, ৪০৮৪)।
দাজ্জালের আবির্ভাবের আগে পৃথিবীতে ত্রিশজন ছোট দাজ্জাল বা কাজ্জাবের আবির্ভাব ঘটবে, যারা প্রত্যেকেই নিজেকে মাহদী বা নবী দাবি করবে (সহীহ বুখারী, ৩৬০৯)। আজ আমরা সেই ফিতনার যুগেই বাস করছি। তাই ইন্টারনেটের গুজবে মেতে না উঠে আমাদের উচিত সহীহ হাদীসের জ্ঞান অর্জন করা। ইমাম মাহদীর আগমনের প্রতীক্ষা মানে কেবল আকাশ পানে চেয়ে থাকা নয়, বরং নিজেকে একজন খাঁটি মুমিন হিসেবে গড়ে তোলা—যাতে তাঁর আগমনের দিনে আমরা হকের পথে থেকে তাঁর সাথী হতে পারি।

আপনার মতামত লিখুন :