বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১২ ফাল্গুন ১৪৩২

রমজানে ইচ্ছাকৃত রোজা ভঙ্গ: শাস্তি, মুক্তি এবং সঠিক ক্ষতিপূরণ পদ্ধতি

উম্মাহ কণ্ঠ ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২৬, ০২:০৭ পিএম
রমজানে ইচ্ছাকৃত রোজা ভঙ্গ: শাস্তি, মুক্তি এবং সঠিক ক্ষতিপূরণ পদ্ধতি

রোজার পবিত্রতা ও আইনি বিধানের বিশ্লেষণ / Ai

রমজান মাস—রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের এক বারতা নিয়ে আমাদের দ্বারে উপস্থিত হয়। প্রতিটি মুমিনের হৃদয়ে এই মাসকে ঘিরে থাকে এক গভীর আবেগ। আমরা সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত শুধুমাত্র মহান রবের সন্তুষ্টির আশায় ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্থ থাকি। কিন্তু অনেক সময় অনিচ্ছাকৃত ভুল বা নফসের তাড়নায় ফরজ রোজাটি ভেঙে গেলে মুমিনের হৃদয়ে অনুশোচনার আগুন জ্বলে ওঠে। রোজা ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি, তাই এর বিধান জানা আমাদের জন্য অপরিহার্য। আজ আমরা ইসলামের সুমহান শিক্ষার আলোকে জানব—রোজা না রাখার বা ভেঙে ফেলার কাজা, কাফফারা ও ফিদিয়ার সঠিক মাসয়ালা।

কাফফারা কী এবং কখন ওয়াজিব হয়? আরবি শব্দ ‘কাফফারা’ (Kaffarah) এর মূল অর্থ হলো ঢেকে দেওয়া বা মুছে ফেলা। পরিভাষায়, রমজানের রোজা ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো শরীয়তসম্মত কারণ ছাড়াই ভেঙে ফেলার কারণে যে বিশেষ কঠিন ক্ষতিপূরণ আদায় করতে হয়, তাকেই কাফফারা বলে।

যদি কোনো ব্যক্তি রমজান মাসে রোজা রাখার নিয়ত করার পর শরীয়তসম্মত ওজর (যেমন: হঠাৎ মারাত্মক অসুস্থতা বা সফর) ছাড়াই ইচ্ছাকৃতভাবে পানাহার করে বা স্ত্রীর সাথে সহবাসে লিপ্ত হয়, তবে তার ওপর কাজা এবং কাফফারা উভয়ই ওয়াজিব হয়ে যায়। সহীহ বুখারীর বর্ণনা অনুযায়ী, এক ব্যক্তি রোজা অবস্থায় স্ত্রীর সাথে মিলিত হয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে এসে হাহাকার করে বলেছিল, "আমি ধ্বংস হয়ে গেছি!" নবীজি ﷺ তখন তাকে কাফফারা আদায়ের নির্দেশ দেন। তবে ভুলবশত কিছু খেয়ে ফেললে বা পান করলে রোজা ভাঙে না এবং কাফফারাও ওয়াজিব হয় না।

কাফফারা আদায়ের ৩টি পদ্ধতি ইসলামী শরীয়তে কাফফারা আদায়ের তিনটি পদ্ধতি ক্রমানুসারে নির্ধারণ করা হয়েছে:

প্রথমত: একটি দাস মুক্ত করা (যা বর্তমান যুগে দাসপ্রথা না থাকায় প্রযোজ্য নয়)।

দ্বিতীয়ত (টানা ৬০ রোজা): একটি রোজা ইচ্ছাকৃত ভঙ্গের শাস্তিস্বরূপ একটানা দুই মাস বা ৬০ দিন রোজা রাখতে হবে। এই ৬০ দিনের মধ্যে একদিনও বিরতি দিলে (শরীয়তসম্মত কারণ ছাড়া) পুনরায় ১ থেকে গণনা শুরু করতে হবে। এটি মূলত নফসের অবাধ্যতার এক কঠিন দণ্ড।

তৃতীয়ত (মিসকিনকে খাবার): যদি কেউ বার্ধক্য বা স্থায়ী অসুস্থতার কারণে ৬০টি রোজা রাখতে শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ অক্ষম হন, তবে তিনি ৬০ জন মিসকিনকে দুই বেলা পেট ভরে তৃপ্তিসহকারে খাবার খাওয়াবেন অথবা সমপরিমাণ অর্থ (সাদাকাতুল ফিতর সমতুল্য) দান করবেন।

ফিদিয়া: স্থায়ীভাবে অক্ষমদের জন্য বিকল্প অনেকেই কাফফারা আর ফিদিয়াকে গুলিয়ে ফেলেন। ফিদিয়া (Fidya) হলো তাদের জন্য, যারা বার্ধক্য বা এমন দীর্ঘস্থায়ী রোগের কারণে রোজা রাখতে সম্পূর্ণ ও স্থায়ীভাবে অক্ষম যে ভবিষ্যতে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, “আর যাদের জন্য রোজা রাখা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য, তারা এর পরিবর্তে ফিদিয়া দেবে—একজন মিসকিনকে খাবার খাওয়ানো” (সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৪)। সাময়িক অসুস্থ ব্যক্তি ফিদিয়া দিতে পারবেন না; তাকে সুস্থ হওয়ার পর ‍‍`কাজা‍‍` আদায় করতে হবে।

উপসংহার ও তওবা কাফফারা বা ফিদিয়া কেবল আইনি জরিমানা নয়; এটি আল্লাহর বিধানের প্রতি আমাদের অবহেলার প্রায়শ্চিত্ত। রমজানের প্রতিটি মুহূর্ত জান্নাত কামানোর সুযোগ। শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে এই সুযোগ হারানো বুদ্ধিমান মুমিনের কাজ নয়। যদি ভুল হয়েই যায়, তবে কালবিলম্ব না করে তওবা করতে হবে এবং সঠিক পদ্ধতিতে ক্ষতিপূরণ আদায় করতে হবে। আল্লাহ আমাদের সকলকে রমজানের পূর্ণ হক আদায় করার তৌফিক দিন। আমিন।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

কোরআন বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!