বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১২ ফাল্গুন ১৪৩২

রমজানেই কি যাকাত দিতে হবে? সওয়াব বৃদ্ধির রহস্য ও সঠিক শরয়ী নিয়ম

উম্মাহ কণ্ঠ ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২৬, ০৪:১৫ পিএম
রমজানেই কি যাকাত দিতে হবে? সওয়াব বৃদ্ধির রহস্য ও সঠিক শরয়ী নিয়ম

রমজানের পবিত্রতায় যাকাতের মাধ্যমে সম্পদ পরিশোধন।

রমজান মাস মুসলিম উম্মাহর জন্য ইবাদত-বন্দেগি, আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক সুবর্ণ সুযোগ। যখন জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয় এবং প্রতিটি নেক আমলের প্রতিদান বহুগুণে বৃদ্ধি পায়, তখন মুমিনের হৃদয়ে একটাই আকাঙ্ক্ষা থাকে—কীভাবে রবের সন্তুষ্টি অর্জন করা যায়। এই বরকতময় মাসে আমাদের অনেকের মনেই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জাগে: যাকাত কি কেবল রমজানেই দিতে হয়? যাকাত ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে অন্যতম একটি ফরজ ইবাদত। কিন্তু আমাদের সমাজের অধিকাংশ মানুষই রমজান মাসকে যাকাত আদায়ের একমাত্র সময় মনে করেন। এই বিষয়ে সঠিক জ্ঞান না থাকলে আমরা একদিকে যেমন আল্লাহর নির্দেশ পালনে ভুল করতে পারি, অন্যদিকে রমজানের এই বরকতময় সুযোগকে ভুলভাবে কাজে লাগাতে পারি।

রমজানে যাকাতের ফজিলত: সওয়াব বৃদ্ধির গাণিতিক হিসাব
রমজানে যাকাত দিলে কি বেশি সওয়াব পাওয়া যায়? এর উত্তর হলো—হ্যাঁ। রমজান মাসে যেকোনো ইবাদতের মর্যাদা ও প্রতিদান বহুগুণ বেড়ে যায়। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

“রমজান মাসে যে ব্যক্তি একটি নফল আদায় করল, সে যেন অন্য মাসে একটি ফরজ আদায় করল। আর যে এ মাসে একটি ফরজ আদায় করল, সে যেন অন্য মাসে সত্তরটি ফরজ আদায় করল।” (বাইহাকী, শুআবুল ঈমান)

যাকাত নিজেই একটি ফরজ ইবাদত। আপনি যদি এই ফরজটি রমজান মাসে আদায় করেন, তবে আল্লাহ তায়ালা আপনাকে অন্য মাসে ৭০টি যাকাত দেওয়ার সমান সওয়াব দান করতে পারেন। এটি মুমিনের জন্য এক অকল্পনীয় সুযোগ।

যাকাত আদায়ের সময়: বিলম্ব বনাম অগ্রিম
যাকাত আদায়ের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ শরয়ী মূলনীতি হলো—যাকাত যখন ফরজ হয়, তখনই তা আদায় করা ওয়াজিব। যদি কারো নেসাব পরিমাণ সম্পদ পূর্ণ এক হিজরি বছর পার করে মহররম বা সফর মাসে, তবে তার জন্য রমজান পর্যন্ত যাকাত আটকে রাখা জায়েজ নয়। গরিবের হক আটকে রাখার অধিকার ইসলাম কাউকে দেয়নি। তবে রমজানের সওয়াব হাসিলের জন্য দুটি বিকল্প পথ রয়েছে:

অগ্রিম যাকাত (তাজিলুজ্জাকাত): আপনার যাকাত বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই আপনি রমজানে অগ্রিম যাকাত দিতে পারেন। এটি সম্পূর্ণ জায়েজ এবং এর মাধ্যমে রমজানের ৭০ গুণ সওয়াব পাওয়া সম্ভব।

যাকাত বর্ষ নির্ধারণ: যদি আপনার যাকাত ফরজ হওয়ার হিসাবচক্র রমজানকেন্দ্রিক হয়, তবে এটি সবচেয়ে উত্তম ও নিরাপদ পদ্ধতি।

যাকাতের হকদার ও সামাজিক প্রভাব
যাকাত কোনো করুণা নয়; এটি ধনীদের সম্পদে গরিবের অধিকার। পবিত্র কুরআনে (সূরা আত-তওবা, ৯:৬০) যাকাতের জন্য নির্দিষ্ট আটটি খাত নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ফকির, মিসকিন, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি এবং আল্লাহর পথে নিয়োজিত ব্যক্তিরা অন্যতম। বিশেষ করে নিজের অভাবী আত্মীয়-স্বজনদের যাকাত দিলে দ্বিগুণ সওয়াব পাওয়া যায়—একটি যাকাতের, অন্যটি আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করার।

রমজানে যাকাত আদায়ের মাধ্যমে অভাবী মানুষগুলো স্বাচ্ছন্দ্যে সাহরি ও ইফতারের আয়োজন করতে পারে এবং ঈদের আনন্দে শরিক হতে পারে। এটি সমাজে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করে এবং দাতার অন্তরে থাকা কৃপণতা ও লোভ দূর করে।

উপসংহার
রমজান মাসে যাকাত আদায় করা নিঃসন্দেহে ফজিলতপূর্ণ, তবে তা যেন শরীয়তের নিয়ম লঙ্ঘন করে না হয়। যাকাত ফরজ হয়ে গেলে তা আটকে রাখা গুনাহ, বরং প্রয়োজনে অগ্রিম দিয়ে রমজানের বরকত হাসিল করাই বুদ্ধিমানের কাজ। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সঠিকভাবে যাকাত হিসাব করার এবং তা সময়মতো হকদারদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

কোরআন বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!