২০২৬ সালের মে মাস দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে এক চরমতম এবং প্রাণঘাতী অধ্যায় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে তাপমাত্রা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যা এই অঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত করে তুলেছে। কিছু কিছু এলাকায় পারদ ইতিমধ্যে ৪৫ থেকে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বিপজ্জনক সীমা অতিক্রম করেছে। আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এই পরিস্থিতিকে একটি বড় দুর্যোগ বা ক্যালামিটি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। কেবল পরিসংখ্যান নয় বরং মাঠ পর্যায়ের বাস্তব চিত্র বলছে যে এই তাপপ্রবাহ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি তীব্র এবং দীর্ঘস্থায়ী। বিশেষজ্ঞরা একে কেবল প্রাকৃতিক ঘটনা বলতে নারাজ বরং এর পেছনে মানুষের সৃষ্টি করা জলবায়ু পরিবর্তনের অকাট্য প্রমাণ পাচ্ছেন তারা।
এই চরম আবহাওয়ার নেপথ্যে থাকা বিজ্ঞানসম্মত কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে বায়ুমণ্ডলের উচ্চচাপ বলয় বা হাই প্রেসার সিস্টেম এক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করছে। ভারতের ভারতী ইনস্টিটিউট অফ পাবলিক পলিসির গবেষণা পরিচালক আনজল প্রকাশ আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি জানান যে উচ্চচাপের এই সিস্টেমগুলো ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি গরম বাতাসকে অনেকটা গম্বুজের মতো আটকে ফেলে। এই গরম বাতাস উপরে উঠে ঠান্ডা হতে পারে না এবং চাপের কারণে সংকুচিত হয়ে আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যা আদিয়াব্যাটিক ওয়ার্মিং হিসেবে পরিচিত। এই পদ্ধতিটি আকাশকে মেঘমুক্ত রাখে যার ফলে সূর্যের প্রখর রশ্মি সরাসরি মাটিতে পড়ে তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়।
একই সময়ে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রাক-মৌসুমি বৃষ্টিপাতের অভাব এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সাধারণত এই সময়ে যে সামান্য বৃষ্টিপাত ভূখণ্ডকে কিছুটা শীতল করত তা এ বছর প্রায় অনুপস্থিত। এর পাশাপাশি আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা এল নিনোর প্রভাবকেও দায়ী করছেন। নাসা এবং বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) তথ্য অনুযায়ী সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া এল নিনো প্যাটার্নের সৃষ্টি করে যা বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়। ডব্লিউএমও প্রধান উইলফ্রান মোফৌমা ওকিয়া গত মাসেই সতর্ক করেছিলেন যে ২০২৬ সালের মে থেকে জুলাই মাসের মধ্যে এল নিনো অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন সরাসরি এল নিনো সৃষ্টি না করলেও এটি এল নিনোর প্রভাবকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় যা বর্তমান দক্ষিণ এশিয়ায় দৃশ্যমান।
এই দাবদাহের প্রাণঘাতী প্রভাব ইতিমধ্যে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। পাকিস্তানে গত মঙ্গলবার তাপজনিত কারণে কমপক্ষে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে স্থানীয় জরুরি পরিষেবাগুলো নিশ্চিত করেছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতেও তাপপ্রবাহের কারণে মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং মহারাষ্ট্রে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। মহারাষ্ট্রের আকোলা এবং অমরাবতীর মতো শহরগুলোতে তাপমাত্রা ৪৬.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত রেকর্ড করা হয়েছে। আল জাজিরা এবং রয়টার্সের প্রতিবেদনে দেখা যায় যে গত ২৪ এপ্রিল বিশ্বের সবচেয়ে তপ্ত ৯০টি শহরের অধিকাংশেরই অবস্থান ছিল ভারতে। এই নজিরবিহীন গরম কেবল শারীরিক অসুস্থতা নয় বরং সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর এক দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
তাপপ্রবাহের এই সংকট সমাজে বিদ্যমান বৈষম্যকেও নতুনভাবে উস্কে দিয়েছে। যারা দিনমজুর, নির্মাণ শ্রমিক বা রাস্তার হকার তাদের জন্য এই গরমে বাইরে কাজ করা জীবন মরণ সমস্যার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে উচ্চবিত্তরা এসি বা আধুনিক সুযোগ সুবিধার মাধ্যমে নিজেদের রক্ষা করতে পারলেও এই অঞ্চলের শ্রমজীবী মানুষের বড় অংশই এই বিপর্যয়ের মূল শিকার। আল জাজিরার পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে যে এই সংকট নির্ধারণ করে দিচ্ছে কার ওপর বোঝার ভার সবচেয়ে বেশি পড়বে এবং কার পক্ষে এটি সহ্য করা সম্ভব। এটি কেবল একটি আবহাওয়াগত সমস্যা নয় বরং এটি একটি গভীর মানবিক এবং সামাজিক সংকট হিসেবে দেখা দিচ্ছে যা মোকাবিলার জন্য রাষ্ট্রগুলোর পক্ষ থেকে জরুরি এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার প্রয়োজন।
ভারত আবহাওয়া বিভাগ (আইএমডি) সতর্ক করে জানিয়েছে যে মে মাস জুড়ে পশ্চিম উপকূল এবং হিমালয়ের পাদদেশ সংলগ্ন এলাকাগুলোতে স্বাভাবিকের চেয়ে ৩ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি তাপমাত্রা থাকতে পারে। পশ্চিমবঙ্গ এবং গুজরাটের মতো রাজ্যগুলোতে অতিরিক্ত চার থেকে পাঁচ দিন চরম তাপপ্রবাহের সম্ভাবনা রয়েছে। জলবায়ু বিজ্ঞানীরা বারবার সতর্ক করছেন যে যদি বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ কমানো না যায় তবে দক্ষিণ এশিয়ায় এমন চরম পরিস্থিতি একটি নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হবে। এখন প্রশ্ন উঠছে যে এই অঞ্চলের ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলো এই চরম বাস্তবতার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে কতটা প্রস্তুত। আবহাওয়া বা জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর গবেষণাপত্রের বিষয় নয় বরং এটি এখন মানুষের ঘরের দোরগোড়ায় কড়া নাড়া এক ধ্বংসাত্মক বাস্তবতা।
