বুধবার, ০৬ মে, ২০২৬, ২৩ বৈশাখ ১৪৩৩

পরিবেশ বলতে কী বোঝায়? প্রকৃতি ও বাস্তুতন্ত্রের সাথে পার্থক্য

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ৬, ২০২৬, ০৭:১৫ পিএম

পরিবেশ বলতে কী বোঝায়? প্রকৃতি ও বাস্তুতন্ত্রের সাথে পার্থক্য

আমাদের চারপাশের ভৌত জগৎ আপাতদৃষ্টিতে যতটা সাধারণ মনে হয়, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে তা অনেক বেশি জটিল। "পরিবেশ" বলতে কী বোঝায়—এমন প্রশ্নের জবাবে অনেকেই কেবল তাদের চারপাশের গাছপালা, মাটি বা জলাশয়কে কল্পনা করেন। তবে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক (National Geographic)-এর বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা অনুযায়ী, পরিবেশের প্রকৃত রূপ শুধুমাত্র ভৌত উপাদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি জীব যে পারিপার্শ্বিক অবস্থা এবং উপাদানগুলোর সাথে প্রতিনিয়ত মিথস্ক্রিয়া করে, তার সবকিছু নিয়েই মূলত পরিবেশ গঠিত। এটি ভৌত, রাসায়নিক এবং জৈবিক বৈশিষ্ট্যের এক অবিচ্ছেদ্য সংমিশ্রণ।

সহজ কথায়, একটি পরিবেশে উপস্থিত সকল সজীব (বায়োটিক) এবং নির্জীব (অ্যাবায়োটিক) উপাদান কোনো নির্দিষ্ট জীবের বেঁচে থাকা, বিবর্তন এবং পূর্ণাঙ্গ বিকাশে সরাসরি ভূমিকা পালন করে। ভাষাগত দিক থেকে পরিবেশের ইংরেজি প্রতিশব্দ "এনভায়রনমেন্ট" (environment) এসেছে ফরাসি শব্দ "এনভায়রন" (environ) থেকে, যার অর্থ হলো চারপাশ ঘিরে রাখা বা আবদ্ধ করা। বিবিসি সায়েন্স (BBC Science)-এর মতে, পরিবেশের ব্যাপ্তি অত্যন্ত বিশাল। এটি একটি অণুবীক্ষণিক স্তর থেকে শুরু করে পৃথিবীর সম্পূর্ণ বৈশ্বিক কাঠামো পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।

সাধারণ আলোচনার সময় মানুষ প্রায়শই "ইকোসিস্টেম" (বাস্তুতন্ত্র) এবং "পারিপার্শ্বিকতা" (surroundings)-কে পরিবেশের সমার্থক শব্দ হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন। তবে বিজ্ঞানীরা এই পরিভাষাগুলোর মধ্যে সুনির্দিষ্ট পার্থক্য টেনেছেন। ইকোলজিক্যাল ডেফিনিশন অনুযায়ী, "পারিপার্শ্বিকতা" বলতে কেবল একটি জীব বা জনগোষ্ঠীর চারপাশের নির্দিষ্ট ভৌত স্থানকে বোঝায়। অন্যদিকে, পরিবেশ একটি অনেক বড় ধারণা, যা ওই স্থানের সব ধরনের প্রভাবক উপাদানকে ধারণ করে।

আবার, "ইকোসিস্টেম" বা বাস্তুতন্ত্রের সংজ্ঞাটি মূলত কর্মভিত্তিক। পরিবেশের সজীব উপাদানগুলো যখন তাদের পারিপার্শ্বিক নির্জীব উপাদানগুলোর সাথে একটি অবিচ্ছিন্ন মিথস্ক্রিয়ায় আবদ্ধ হয়ে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ইউনিট বা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে, বিজ্ঞানীদের মতে তখনই তাকে ইকোসিস্টেম বলা হয়।

পরিবেশের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত আরেকটি বহুল ব্যবহৃত শব্দ হলো "প্রকৃতি" (Nature)। তাহলে পরিবেশ ও প্রকৃতির মধ্যে মূল পার্থক্য কোথায়? পৃথিবীর সকল সজীব ও নির্জীব বস্তু প্রকৃতির অংশ। তবে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের মতে, প্রকৃতির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর স্বাভাবিক বা প্রাকৃতিক সত্তা। মানুষের তৈরি বা কৃত্রিম কোনো কিছু প্রকৃতির অংশ নয়। উদাহরণস্বরূপ, কংক্রিট ও লোহা দিয়ে তৈরি একটি শহর মানুষের "নির্মিত পরিবেশ" (built environment)-এর একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও, এটিকে কোনোভাবেই প্রকৃতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয় না।

এই জটিল এবং আন্তঃসম্পর্কিত ব্যবস্থাগুলো বোঝার জন্য আধুনিক বিজ্ঞানের বেশ কয়েকটি শাখা নিবেদিতভাবে কাজ করছে। পরিবেশ বিজ্ঞান (Environmental Science) মূলত জীব এবং তাদের পরিবেশের মধ্যকার মিথস্ক্রিয়া এবং এর দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল নিয়ে গবেষণা করে। এর অধীনে থাকা একটি বিশেষায়িত এবং গুরুত্বপূর্ণ শাখা হলো ইকোলজি (Ecology) বা বাস্তুবিদ্যা। বিবিসি সায়েন্স-এর গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইকোলজি মূলত একটি ইকোসিস্টেমের ভেতরের বাস্তুতান্ত্রিক সম্পর্ক এবং শক্তির অবিরাম প্রবাহ নিয়ে কাজ করে।

বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পরিবেশ বিজ্ঞানের এই মৌলিক ধারণাগুলো অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। বিবিসি নিউজের (BBC News) তথ্যমতে, পরিবেশের ব্যাপক অবনতি সরাসরি মানবসমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এর ফলে জাতিসংঘ একটি পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর এবং টেকসই পরিবেশকে মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বাস্তুবিদ্যার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা এখন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন কীভাবে দূষণ এবং মানুষের তৈরি কৃত্রিম পরিবেশ প্রাকৃতিক ইকোসিস্টেমের রাসায়নিক ও জৈবিক বৈশিষ্ট্যগুলোকে বদলে দিচ্ছে, যা পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণের অস্তিত্বের জন্য সরাসরি একটি সতর্কবার্তা।

banner
Link copied!