বর্তমান সময়ের সমাজ ব্যবস্থায় ভিন্ন ভিন্ন প্রজন্মের মানুষের একত্রে সময় কাটানোর মতো সুযোগ বা স্থান ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে। স্কুল, কর্মক্ষেত্র এমনকি বাসস্থানগুলোও এখন প্রায়শই বয়সের ভিত্তিতে বিভক্ত। এই বিচ্ছিন্নতার যুগে পরিবার এবং ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোই মূলত এমন কয়েকটি গুটিকয়েক স্থান হিসেবে টিকে আছে, যেখানে সব বয়সের মানুষ একত্রিত হতে পারে। তবে এই আন্তঃপ্রজন্মের স্থানগুলোকে অর্থবহ করতে হলে বয়স্কদের অবশ্যই আধুনিক যুবসমাজ এবং শিশুদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক বাস্তবতাগুলো গভীরভাবে বুঝতে হবে। অনেক সময় প্রাপ্তবয়স্করা শিশুদের `আগামী দিনের ভবিষ্যৎ` হিসেবে বিবেচনা করে তাদের বর্তমান সমস্যাগুলোকে এড়িয়ে যান। সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, তরুণরা কেবল আগামী দিনের নয়, বরং তারা এই মুহূর্তের একটি সক্রিয় অংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) এর সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যান পরিস্থিতিটির ভয়াবহতা তুলে ধরেছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) দ্বারা প্রকাশিত সিডিসি-এর `ইয়ুথ রিস্ক বিহেভিয়ার সার্ভে` অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে কিশোরীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা এবং বিষণ্ণতা প্রায় ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিশোর এবং তরুণদের মধ্যেও এই উদ্বেগজনক হার ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মানসিক সংকটের পেছনে মূলত দায়ী কোভিড মহামারির দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব এবং সামাজিক মাধ্যমের অবাস্তব প্রত্যাশা।
মহামারির সময় প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়েও শিশুরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ছোট শিশুরা তাদের স্বাভাবিক সামাজিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ সময়টি হারিয়েছে। কীভাবে নতুন বন্ধু তৈরি করতে হয়, অন্যের মতামতের প্রতি সম্মান দেখাতে হয় বা একসাথে খেলতে হয়— এই সাধারণ সামাজিক দক্ষতাগুলো শিখতে তাদের এখন রীতিমতো সংগ্রাম করতে হচ্ছে। অন্যদিকে, ডিজিটাল দুনিয়ার বাসিন্দা হিসেবে এই প্রজন্মের তরুণরা ইন্টারনেটের সাথে সার্বক্ষণিক যুক্ত। এটি তাদের তথ্যপ্রাপ্তি এবং বন্ধুদের সাথে যোগাযোগের সুযোগ করে দিলেও, একই সাথে তাদের উন্মুক্ত করে দিচ্ছে অতিরিক্ত সহিংসতা এবং ঘৃণামূলক আধেয়র সামনে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রদর্শিত নিখুঁত জীবনের কৃত্রিম ছবিগুলো তরুণদের মনে এক ধরনের তীব্র হীনম্মন্যতা তৈরি করছে, যার সাথে মানিয়ে নেওয়া তাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
এই মানসিক উদ্বেগের সবটাই যে কেবল ভার্চুয়াল জগত থেকে আসছে, তা নয়। বাস্তব পৃথিবীর সমস্যাগুলোও তাদের কাঁধে ভারী বোঝার মতো চেপে বসেছে। দ্য গার্ডিয়ান-এর একাধিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বর্তমান প্রজন্মের তরুণরা জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশের বিপর্যয় নিয়ে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি আতঙ্কিত। তারা বিজ্ঞানের সাহায্যে বুঝতে পারছে কীভাবে ইকোসিস্টেম ভেঙে পড়ছে, কিন্তু এই বিপর্যয় রোধে তাদের নিজেদের ক্ষমতাহীনতা তাদের আরও বেশি উদ্বিগ্ন করে তুলছে। এর পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে পশ্চিমা দেশগুলোতে আগ্নেয়াস্ত্র হামলার মতো ঘটনা। প্রতিনিয়ত স্কুলে মেটাল ডিটেক্টরের ভেতর দিয়ে যাওয়া বা বুলেটপ্রুফ ব্যাকপ্যাক ব্যবহারের মানসিক চাপ শিশুদের স্বাভাবিক শৈশবকে কেড়ে নিচ্ছে।
তবে এই সংকটের মধ্যেও আশার আলো রয়েছে। সমাজবিজ্ঞানী এবং ধর্মীয় নেতারা মনে করেন, তরুণদের এই মানসিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে হলে তাদেরকে সমাজের প্রতিটি স্তরে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করতে হবে। পরিবার এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে তরুণরা তাদের ভয়, প্রশ্ন এবং হতাশাগুলো বিনা সংকোচে প্রকাশ করতে পারে। তাদের মতামতকে অবজ্ঞা না করে বা শুধুমাত্র সান্ত্বনার বাণী না শুনিয়ে তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে। তরুণরা যখন বুঝতে পারবে যে তাদের বর্তমান অস্তিত্বকে সম্মান করা হচ্ছে এবং তারা সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, তখনই তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের এই নীরব মহামারি মোকাবেলা করা সম্ভব হবে। একটি সুস্থ সমাজ গঠনে তরুণদের এই দৃষ্টিভঙ্গি এবং অংশগ্রহণ এখন আর কোনো বিকল্প নয়, বরং অপরিহার্য।
